খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই এপ্রিল ২০০০, ৭:৬ পিএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে, পাহাড় আর মেঘের মিতালিতে ঘেরা বান্দরবান জেলার এক অনন্য সীমান্ত জনপদ নাইক্ষ্যংছড়ি। প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলটি একদিকে যেমন চোখ জুড়ানো সবুজ পাহাড়, ঝরনা আর নদী দিয়ে সাজানো, অন্যদিকে তেমনই বহুজাতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এক টুকরো বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশ। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং সীমান্ত অবস্থান একে অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বেশ আলাদা ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার মোট আয়তন ৪৬৩.৬০ বর্গ কিলোমিটার। ভৌগোলিক মানচিত্রে এটি ২১°১১´ থেকে ২১°৪০´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২°০৬´ থেকে ৯২°২৩´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত।
এর সীমানা বিন্যাস বেশ বৈচিত্র্যময়:
এই উপজেলার বুকের ওপর দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে শান্ত শীতল বোয়ালখালী নদী, যা এই অঞ্চলের প্রকৃতির প্রধান প্রাণশক্তি।

ঐতিহাসিকভাবে নাইক্ষ্যংছড়ি থানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে, ১৯২৩ সালে। পরবর্তীতে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ১৯৮৫ সালে এটিকে পূর্ণাঙ্গ উপজেলায় রূপান্তর করা হয়।
উপজেলাটি প্রশাসনিকভাবে ৫টি মূল ইউনিয়নে বিভক্ত। প্রতিটি ইউনিয়ন আবার বেশ কিছু পাহাড়িয়া মৌজা ও ছায়াঢাকা গ্রামে বিন্যস্ত। ইউনিয়নগুলো হলো: ১. নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়ন (এখানেই চাকঢালা অঞ্চলটি অবস্থিত) ২. বাইশারী ইউনিয়ন ৩. ঘুমধুম ইউনিয়ন ৪. দোছড়ি ইউনিয়ন ৫. সোনাইছড়ি ইউনিয়ন

২০১১ সালের আদমশুমারির আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার মোট জনসংখ্যা ৬১,৭৮৮ জন; যার মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৩১,৩৪৭ জন এবং নারীর সংখ্যা ৩০,৪৪১ জন।

এই অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষ পরম সহনশীলতায় একসাথে বসবাস করেন। ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যার হার:

নাইক্ষ্যংছড়ির আসল সৌন্দর্য এর বহুজাতিগত সামাজিক গঠনে। এখানে বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি পাহাড়ি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে মারমা, মুরং (ম্রো), ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা এবং চাকমা জাতির মানুষ যুগ যুগ ধরে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখছেন।

এই উপজেলায় যেমন দাপ্তরিক ও যোগাযোগের প্রধান ভাষা বাংলা, তেমনই সমানতালে প্রচলিত রয়েছে মারমা, মুরং, ত্রিপুরা, চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা ভাষা। আদিবাসীদের নিজস্ব তাঁতে বোনা রঙিন পোশাক, ঐতিহ্যবাহী গান, বাঁশের বাঁশির সুর আর অনন্য নৃত্যরীতি এই অঞ্চলের সংস্কৃতিকে এক রূপসী ক্যানভাসে রূপ দিয়েছে।
এখানে প্রতি বছর বৌদ্ধদের প্রবারণা পূর্ণিমা, মারমা-চাকমাদের সাংগ্রাই বা বিজু (জল উৎসব), মুসলিমদের ঈদ এবং হিন্দুদের দুর্গাপূজা অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে সমভাবে উদযাপিত হয়। পাহাড়ি হাট-বাজারগুলোতে গেলেই বোঝা যায় এখানকার সামাজিক আদান-প্রদান কতটা নিবিড়।

নাইক্ষ্যংছড়িতে শিক্ষার হার গড়ে ৩১.৩%, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে কিছুটা কম। দুর্গম পাহাড় এবং নিজস্ব ভাষার পাঠ্যপুস্তকের অভাব এখানে শিক্ষার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

বর্তমানে উপজেলায় শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে:
তরুণদের মেধা ও মনন বিকাশের জন্য এখানে ৩টি লাইব্রেরি, ১টি আধুনিক অডিটোরিয়াম, ৩টি নাট্যদল, ৩টি প্রগতিশীল মহিলা সংগঠন এবং ৫টি খেলার মাঠ রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তির হার বাড়ানো ও সচেতনতা তৈরির কাজ চলছে।

ভৌগোলিক দুর্গমতার কারণে এই অঞ্চলের স্বাস্থ্য খাত এখনও পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। এখানে চিকিৎসাসেবার জন্য রয়েছে ১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ২টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং গৃহপালিত পশুপাখির জন্য ১টি পশু চিকিৎসা কেন্দ্র।
পাহাড়ি ঢালু অঞ্চলের কারণে স্যানিটেশন ব্যবস্থার চিত্রটি বেশ চ্যালেঞ্জিং:
স্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিন ব্যবহারকারী পরিবার: ২০.৪%
অস্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিন ব্যবহারকারী পরিবার: ৩৭.৬%
ল্যাট্রিন সুবিধা বহির্ভূত পরিবার: ৪২.০% দুর্গম পাড়াগুলোতে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমাতে মোবাইল মেডিকেল ক্যাম্পের বিশেষ প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

যদিও উপজেলার সবকটি ইউনিয়নকেই পল্লিবিদ্যুতায়ন কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে, কিন্তু পাহাড়ি গ্রিডের সীমাবদ্ধতার কারণে মাত্র ২২.৯% পরিবার বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ পায়।
অন্যদিকে, বিশুদ্ধ পানীয় জলের মূল উৎস হলো ভূগর্ভস্থ নলকূপ (৬২.৬%)। তবে পাহাড়ের উঁচুতে বসবাসকারীরা ঝরনা, ছড়া বা ট্যাপের জলের (১.৩%) ওপর এবং বাকি ৩৬.১% মানুষ অন্যান্য প্রাকৃতিক উৎসের ওপর নির্ভর করে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক চমৎকার উদাহরণ এই উপজেলা। এখানে সব ধর্মের মানুষের জন্যই পর্যাপ্ত উপাসনালয় রয়েছে:

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নাইক্ষ্যংছড়ির ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ভূমিকা পালন করেছিল। তৎকালীন পাক হানাদার বাহিনী যখন মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে, তখন স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙালি জনগণ একজোট হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
বিশেষ করে তুমব্রু পাড়া ও সোনাইছড়ি এলাকায় পাকিস্তানি সেনারা নির্মম গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালিয়েছিল। এ অঞ্চলের বহু মুক্তিকামী মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমার (তৎকালীন বার্মা) হয়ে ভারতের ত্রিপুরায় গিয়ে সামরিক ট্রেনিং নেন এবং স্থানীয় গেরিলা ইউনিট গঠন করে শত্রুদের বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই বীরত্বগাথাকে স্মরণীয় করে রাখতে এখানে কিছু স্মারক ফলক থাকলেও, বহু তথ্য আজও সংরক্ষণের দাবি রাখে।

প্রকৃতি দেবী নাইক্ষ্যংছড়িকে অকৃপণ হস্তে সাজালেও বর্তমানে কিছু পরিবেশগত সংকট দেখা দিচ্ছে। পাহাড়ে অতিরিক্ত মাত্রায় জুম চাষ, যত্রতত্র পাহাড় কাটা, বনাঞ্চল উজাড় করে অপরিকল্পিত রাবার বাগান তৈরির ফলে জলবায়ুর ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে প্রতি বছর বর্ষাকালে পাহাড় ধস ও আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। বর্ষায় অনেক দুর্গম পাড়ার রাস্তাঘাট ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যার ফলে খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকট তৈরি হয়। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় স্তরে উদ্ধারকারী দল (Rescue Team) গঠনের কাজ চলমান রয়েছে।

নাইক্ষ্যংছড়ির অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকা মূলত মাটির সাথে জড়িয়ে। এখানকার জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান প্রধান উৎস হলো:

সমতলে ধান, আখ ও শাকসবজি চাষ হলেও পাহাড়ি ঢালে ঐতিহ্যবাহী জুম পদ্ধতিতে তিল, তুলা, ভুট্টা, পান, তামাক, আদা ও হলুদ চাষ হয়। এখানকার কলা, কাঁঠাল, আনারস ও পেঁপে স্বাদে অতুলনীয়। এছাড়াও কুটিরশিল্প হিসেবে বাঁশ-বেতের কাজ, তাঁতশিল্প এবং কাঠের কাজ বেশ জনপ্রিয়।

এখানকার নারীরা ঘরের কাজের পাশাপাশি পাহাড়ে জুম চাষে সমান ভূমিকা রাখেন। তবে এখনো নারীদের শিক্ষার হার ও সামাজিক সুরক্ষা কিছুটা পিছিয়ে। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ ও এনজিওর মাধ্যমে নারীদের আত্মনির্ভরশীল করতে সেলাই ও হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

পাহাড়ি আঁকাবাঁকা ও ঢালু পথের কারণে এখানে সড়ক যোগাযোগ বেশ রোমাঞ্চকর। উপজেলায় বর্তমানে পিচঢালা পাকা রাস্তা ২২ কিমি, আধা-পাকা রাস্তা ২৫ কিমি এবং মাটির কাঁচা রাস্তা রয়েছে প্রায় ৩৩ কিমি। এখানকার প্রধান গণপরিবহন হলো চাঁদের গাড়ি (মাইক্রোবাস/জিপ)।
যোগাযোগের প্রধান ৩টি রুট হলো: ১. বান্দরবান-লামা-আলীকদম-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়ক ২. বান্দরবান-থানচি-আলীকদম-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়ক ৩. বান্দরবান-কেরানিহাট-চকরিয়া-রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়ক
যাঁরা অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য নাইক্ষ্যংছড়ি এক স্বর্গরাজ্য। সবুজ পাহাড় আর মেঘের লুকোচুরির মাঝে এখানে দেখার মতো অনেক জায়গা রয়েছে:
যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে নাইক্ষ্যংছড়ি অবহেলিত রয়ে গেছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো: ১. দুর্বল সড়ক নেটওয়ার্ক: বর্ষায় পাহাড় ধসে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়া। ২. সীমান্ত নিরাপত্তা ঝুঁকি: মিয়ানমার সীমান্তের অস্থিরতা, চোরাচালান ও মাদক পাচারের কারণে মাঝেমধ্যেই এখানকার সামাজিক শান্তি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হয়। ৩. চিকিৎসক ও শিক্ষক সংকট: প্রত্যন্ত অঞ্চল হওয়ায় হাসপাতাল ও স্কুলগুলোতে দক্ষ জনবলের অভাব।
নাইক্ষ্যংছড়িকে একটি আদর্শ মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:
নাইক্ষ্যংছড়ির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি সুপরিকল্পিত মাস্টার প্ল্যান (Integrated Development Master Plan)-এর ওপর। যেখানে কৃষি, পর্যটন এবং পরিবেশ রক্ষা—সবকিছু একসাথে গুরুত্ব পাবে। এখানকার বৈচিত্র্যময় জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক সামাজিক সংহতি ধরে রাখা এবং যুবসমাজকে ফ্রিল্যান্সিং বা তথ্যপ্রযুক্তির (ICT) ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ করে তুলতে পারলে এই সীমান্ত জনপদটি দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক ও পর্যটন হাবে রূপান্তরিত হতে পারে।
মন্তব্য