খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই জানুয়ারি ২০১৫, ৮:৭ এএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি অনন্য পার্বত্য জেলা হলো বান্দরবান। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও ইতিহাসে সমৃদ্ধ এই জেলার রয়েছে একটি বিশেষ ও চিত্তাকর্ষক পটভূমি, যা অঞ্চলটির নামকরণ থেকে শুরু করে প্রশাসনিক গঠনের প্রতিটি ধাপে পরিলক্ষিত হয়।
বান্দরবানের নামকরণ নিয়ে একটি লোককথা এই জনপদের মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত। কথিত আছে, এক সময় এই এলাকায় অসংখ্য বানর বসবাস করত। তারা প্রতিনিয়ত শহরের প্রবেশ মুখে ছড়ার পাড়ে পাহাড়ে লবণ খেতে আসত। একসময় অতিবৃষ্টির ফলে ছড়ার পানির স্তর বেড়ে গেলে বানরের দলটি সরাসরি ছড়া পার হতে না পেরে একে অপরকে ধরে ধরে সারিবদ্ধভাবে ছড়া পার হতো। স্থানীয় মানুষের চোখে ধরা পড়ে এই বিরল দৃশ্য। সেই থেকে এলাকাটি পরিচিতি পায় “ম্যাঅকছি ছড়া” নামে। মার্মা ভাষায় “ম্যাঅক” অর্থ বানর এবং “ছিঃ” অর্থ বাঁধ বা বাধা। কালের বিবর্তনে ও বাংলা ভাষাভাষী মানুষের উচ্চারণে এই নামই রূপান্তরিত হয়ে “বান্দরবান” নাম ধারণ করে এবং তা সরকারি দলিলপত্রে স্থায়ী নাম হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তবে স্থানীয় মার্মা জনগোষ্ঠী এখনও এই স্থানকে “রদ ক্যওচি ম্রো” নামে ডাকে, যা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির পরিচায়ক। আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন বান্দরবান জেলার নামকরণের ইতিহাস।
বান্দরবানের প্রশাসনিক ইতিহাসও দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়। ব্রিটিশ শাসনামলে, ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সে সময় বান্দরবান এই পার্বত্য জেলার অধীন ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন ক্যাপ্টেন মাগ্রেথ। ১৮৬৭ সালে এই পদটির দায়িত্ব ও পরিধি বাড়ানো হয় এবং নাম পরিবর্তন করে ডেপুটি কমিশনার করা হয়। ডেপুটি কমিশনার হিসেবে টি. এইচ. লুইন ছিলেন প্রথম ব্যক্তি।
১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন অনুযায়ী পুরো পার্বত্য অঞ্চলকে তিনটি সার্কেলে ভাগ করা হয়—চাকমা সার্কেল, মং সার্কেল ও বোমাং সার্কেল। প্রত্যেক সার্কেলের জন্য একজন করে সার্কেল চীফ নিযুক্ত হতো। তৎকালীন বান্দরবান ছিল বোমাং সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত। তাই এই এলাকার আদি নাম ছিল “বোমাং থং”।
বান্দরবান ১৯৫১ সালে প্রথমবারের মতো একটি মহকুমা হিসেবে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করে, এবং এটি রাঙ্গামাটি জেলার অন্তর্গত ছিল। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালের ১৮ই এপ্রিল, তৎকালীন লামা মহকুমার ভৌগলিক ও প্রশাসনিক সীমানাসহ সাতটি উপজেলার সমন্বয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
এইভাবে দীর্ঘ ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সমন্বয়ে গঠিত বান্দরবান জেলা, আজও তার অতীতের গৌরব ও ঐতিহ্য ধারণ করে চলছে। এটি শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক ইউনিট নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ভরপুর অঞ্চল, যা বাংলাদেশের মানচিত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
মন্তব্য