খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই জানুয়ারি ২০১৫, ৫:৪৪ এএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত বান্দরবান জেলা কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়, এটি যেন প্রকৃতি ও সংস্কৃতির তুলিতে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস। পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের আনাগোনা, গহীন অরণ্য চিরে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি নদী আর আদিবাসী সংস্কৃতির অপার মহিমায় মোড়ানো এই জেলাটি এদেশের পর্যটনের মুকুটমণি। মারমা, ত্রিপুরা, চাকমা, বম, মুরংসহ মোট ১১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শত বছরের ঐতিহ্য, মনোরম জলবায়ু এবং পাহাড়ি জীবনের অপার বৈচিত্র্য একে দিয়েছে এক অনন্য ও কালজয়ী মর্যাদা। ‘বান্দরবান’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থই হলো ‘বনের শহর’ বা ‘বাঁদরদের বাঁধ তৈরির স্থান’। নামকরণের সেই প্রাচীন লোককথা থেকে শুরু করে আজকের ‘বাংলাদেশের ছাদ’ হয়ে ওঠার গল্প—সবখানেই জড়িয়ে আছে এক তীব্র মুগ্ধতা।

ট্রেকিং এবং রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষদের কাছে বান্দরবান এক স্বর্গভূমি। দেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় ও পর্বতশৃঙ্গগুলোর সিংহভাগই এই জেলায় অবস্থিত। এদেশের অন্যতম সুউচ্চ শৃঙ্গ কেওক্রাডং জয় করার স্বপ্ন দেখেন সব পর্বতারোহী। এর পাশাপাশি তাজিংডং এবং সাকা হাফং-এর মতো মেঘছোঁয়া পাহাড়গুলো এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতিকে এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছে। যদি পায়ে হেঁটে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে না-ও চান, তবে চিম্বুক পাহাড়, ডিম পাহাড় কিংবা তমা তুঙ্গীর মতো জায়গাগুলো আপনাকে গাড়িতে চড়েই মেঘের রাজ্যে নিয়ে যাবে। চিম্বুকের আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা ধরে ওপরে উঠতে উঠতে মনে হয়, জানালার কাচ গলে মেঘের দল বুঝি গাড়ির ভেতরেই ঢুকে পড়ছে।
পাহাড়ের এই বিশালতার বুকেই লুকিয়ে আছে এক আদিম রহস্য, যার নাম বগাকাইন হ্রদ বা স্থানীয়দের প্রিয় ‘বগা লেক’। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় বারোশ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই হ্রদটি নিয়ে প্রচলিত আছে নানা পাহাড়ি উপকথা। কেউ বলেন এটি মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ, আবার কেউ বলেন কোনো এক প্রাচীন দেবতার কোপে রাতের আঁধারে তলিয়ে গিয়েছিল এক পাহাড়ি গ্রাম। এই হ্রদের পানি কেন কখনো নীল আর কখনো ঘোলাটে রূপ নেয়, সেই রহস্য আজও কাটেনি। বগা লেকের শান্ত জলরাশির পাশাপাশি রুমা উপজেলার কিয়াচলং লেকও তার চারপাশের সবুজের চাদর নিয়ে প্রকৃতিপ্রেমীদের এক পরম প্রশান্তি দেয়।

বান্দরবানের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর গহীন অরণ্যের ঝরনা আর জলপ্রপাতগুলোর গর্জনে। বর্ষার মৌসুমে যখন পাহাড়গুলো প্রাণ ফিরে পায়, তখন এই ঝরনাগুলোর রূপ হয়ে ওঠে প্রলয়ংকরী ও মোহনীয়।
এদের মধ্যে রেমাক্রী অঞ্চলের নাফাখুম জলপ্রপাতকে বলা হয় ‘বাংলাদেশের নায়াগ্রা’। সাঙ্গু নদীর বুক চিরে বয়ে আসা পানির তীব্র স্রোত যখন বিশাল পাথরের চাঁই বেয়ে নিচে আছড়ে পড়ে, তখন তৈরি হয় এক আশ্চর্য কুয়াশার মেঘ। নাফাখুমের চেয়েও দুর্গম ও আদিম এক সৌন্দর্যের নাম অমিয়াখুম। গভীর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে অবস্থিত এই জলপ্রপাতটি দেখতে যাওয়া যেমন কষ্টের, এর সামনে গিয়ে দাঁড়ালে প্রকৃতির বিশুদ্ধতা সমস্ত ক্লান্তি এক নিমেষে ধুয়ে দেয়।
রুমা উপজেলায় গেলে দেখা মিলবে ঋজুক জলপ্রপাতের, যা সরাসরি সাঙ্গু নদীর বুকে এসে আছড়ে পড়ে। নৌকা করে সাঙ্গু নদী দিয়ে যাওয়ার সময় দূর থেকে ঋজুকের পতন দেখার অভিজ্ঞতা আজীবন মনে রাখার মতো। এছাড়া জাদিপাই ঝর্ণা, যা এদেশের অন্যতম সর্বোচ্চ ঝরনা হিসেবে পরিচিত, তার পানির ধারা আদিবাসী পাড়ার কোল ঘেঁষে প্রবহমান। অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের পছন্দের তালিকায় আরও রয়েছে চিংড়ি ঝরনা, ডামতুয়া ঝরনা, ত্লাবং ঝরনা, তিনাপ সাইতার, লুং ফের ভা সাইতার এবং পাতুন হিলি লুসাই প্যাথলজির মতো অসংখ্য নাম না জানা জলপ্রপাত। শহরের খুব কাছেই রয়েছে শৈলপ্রপাত, যেখানে চড়াই-উতরাই না পেরিয়েই ঝরনার শীতল পানির ছোঁয়া পাওয়া যায়।

বান্দরবান শহর এবং এর আশপাশে গড়ে উঠেছে দেশের সেরা কিছু পর্যটন কেন্দ্র। এর মধ্যে নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্রের নাম সারা বিশ্বেই সমাদৃত। তুলোর মতো সাদা মেঘের সমুদ্র যদি হাত দিয়ে ছুঁতে চান, তবে নীলগিরির কোনো বিকল্প নেই। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে যখন নিচে তাকানো যায়, তখন মনে হয় পুরো পৃথিবীটাই বুঝি মেঘের চাদরে ঢাকা পড়ে গেছে। শহরের ঠিক কোলেই অবস্থিত নীলাচল, যা সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখার জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যবেক্ষণ পয়েন্ট। বিকেলে নীলাচলের চূড়ায় বসে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে সূর্যের ডুবে যাওয়া দেখার জন্য প্রতিদিন শত শত পর্যটক ভিড় করেন।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি বান্দরবান তার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপত্যের জন্যও বিখ্যাত। শহরের কাছেই পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত ‘বুদ্ধ ধাতু জাদি’, যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘স্বর্ণ মন্দির’ নামে পরিচিত। সোনালী রঙের এই বৌদ্ধ স্তূপটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম দর্শনীয় ধর্মীয় স্থাপত্য। রোদের আলোয় যখন এই জাদির চূড়া ঝলমল করে ওঠে, তখন দূর থেকে একে কোনো স্বর্গীয় প্রাসাদ বলে ভ্রম হয়। এছাড়া শহরের রাজবিহার এবং উজানিপাড়া বিহার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র উপাসনালয় ও প্রাচীন সংস্কৃতির ধারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের এই শান্ত ও পবিত্র আবহের মাঝেই দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে গড়ে উঠেছে সুসংগঠিত ও সুপরিকল্পিত বান্দরবান সেনানিবাস।

বান্দরবানের প্রকৃত প্রাণ হলো এর রেমাক্রী বা জীবননগরের মতো পাহাড়ি পাড়াগুলো। সাঙ্গু নদীতে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় চড়ে রেমাক্রী যাওয়ার পথটি পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর এক জলপথ। দুপাশে সুউচ্চ পাহাড় আর মাঝখান দিয়ে পাথুরে তলানির সাঙ্গু নদী—এই দৃশ্য কোলাহলময় জীবনকে এক লহমায় ভুলিয়ে দেয়। এখানকার মাচাং ঘরে থাকা আদিবাসীদের সরল জীবনযাত্রা, জুম চাষের পদ্ধতি এবং ঐতিহ্যবাহী খাদ্যাভ্যাস পর্যটকদের যান্ত্রিক জীবনের বাইরে এক নতুন জীবনদর্শন শেখায়।
বান্দরবান যে কেবল প্রকৃতি আর ঐতিহ্যে ঘেরা তা নয়, আধুনিক শিক্ষা ও সংস্কৃতির আলোতেও এটি সমানভাবে ভাস্বর। জেলার প্রাচীনতম ও অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘বান্দরবান সরকারি কলেজ’ দুর্গম পাহাড়ের তরুণদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে প্রতি বছর বহু শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার মূল স্রোতে যুক্ত হচ্ছে।
দিনশেষে বান্দরবান কোনো সাধারণ পর্যটন কেন্দ্র নয়; এটি হলো মানুষের সাথে প্রকৃতির, ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষের পারস্পরিক সহনশীলতার এক জীবন্ত দলিল। এখানে এসে পাহাড়ের বুকে হারিয়ে যাওয়া মানে নিজের ভেতরের এক নতুন সত্তাকে আবিষ্কার করা। আপনি যদি মেঘের দেশে ডানা মেলতে চান, তবে বান্দরবান সবসময়ই আপনার জন্য এক নতুন মুগ্ধতা ও জীবনের গল্প নিয়ে অপেক্ষা করছে।
মন্তব্য