খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই জানুয়ারি ২০১৫, ৬:২৫ এএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত পার্বত্য অঞ্চলের এক অনন্য জনপদ বান্দরবান। চমত্কার পাহাড়ী উপত্যকা, ঘন অরণ্য আর মেঘের আনাগোনার আড়ালে লুকিয়ে আছে এই অঞ্চলের এক দীর্ঘ, বৈচিত্র্যময় ও বিস্ময়কর ইতিহাস। বহুকাল ধরে নানান জাতিগোষ্ঠী, পরাক্রমশালী শাসক এবং বিচিত্র সাংস্কৃতিক ধারার হাত ধরে গড়ে উঠেছে আজকের বান্দরবান। ইতিহাসের পাতায় এই জেলাটি কেবল একটি প্রশাসনিক অঞ্চল নয়, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা রাজন্য শাসন, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং রূপান্তরের এক জীবন্ত দলিল।

বান্দরবানের ইতিহাসের গোড়াপত্তন ঘটেছিল বহু শতাব্দী আগে। এই অঞ্চলের প্রাচীন প্রশাসনিক কাঠামোর সর্বপ্রাচীন তথ্য পাওয়া যায় তুংগো সাম্রাজ্যের হাইসাওয়াদি রাজ্যের সার্কেল প্রধান তবাং শোয়েথী-এর দিনলিপিতে, যিনি ১৫৩১ সালে এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিযুক্ত হন।
পরবর্তীতে ঐতিহ্যবাহী বোমাং রাজবংশ এখানে স্থায়ীভাবে শাসন শুরু করে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে এই বংশের ধারাবাহিকতায় পঞ্চম বোমাং কং হ্লা প্রু (১৭২৭–১৮১১) এবং ষষ্ঠ বোমাং সাক থাই প্রু-কে গভর্নর হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই গৌরবময় রাজবংশের শাসনকালেই বান্দরবানের প্রাচীন নাম ছিল ‘বোমাং থং’ বা বোমাং রাজার দেশ।

প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার আগে বান্দরবান অঞ্চলে একাধিকবার বড় ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তন এসেছে:

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসে বান্দরবানের পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর অবদান অনন্য। রণকৌশলগত কারণে এই দুর্গম অঞ্চলটি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
বর্তমানে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার অধীনস্থ তুমুক্রু পাড়া এবং সোনাইছড়ি জুমখোলা পাড়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তিশালী অস্থায়ী ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল। এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা স্থানীয়দের ওপর নির্মম গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং অমানুষিক নির্যাতন চালায়। পাহাড়ের আদিবাসী ও সমতলের বাঙালি—উভয় জনগোষ্ঠীই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সে সময় চরম দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের রক্তিম সূর্যকে ছিনিয়ে এনেছিল।

দেশভাগের পর থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশে বান্দরবানের প্রশাসনিক কাঠামো ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হয়েছে:

নিচে একটি সহজ কালপঞ্জির মাধ্যমে ৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শুরু করে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বান্দরবানের ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারা তুলে ধরা হলো:

বান্দরবান শুধু চোখ জুড়ানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই বিখ্যাত নয়; এটি বাংলাদেশের অনন্য এক পাহাড়ি জেলা যা বহুবর্ণ সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাস বহন করে চলেছে। মারমা, ম্রো, ত্রিপুরা, বম, খুমি, তঞ্চঙ্গ্যাসহ প্রায় ১১টি ভিন্ন ভাষার নৃগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে এখানে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছে। রাজাদের প্রাচীন প্রথা থেকে শুরু করে ব্রিটিশদের বিশেষ আইন, আর মহান মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগ—সবকিছুই এই অঞ্চলের মানুষের আত্মপরিচয় নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে। তাই বান্দরবানের ইতিহাস জানা মানে কেবল একটি অঞ্চলের অতীতকে জানা নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গভীরতাকে উপলব্ধি করা।
মন্তব্য