খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই জানুয়ারি ২০১৫, ৮:৭ এএম

বান্দরবান—শব্দটি উচ্চারণ করার সাথেই মনের ভেতর এক অদ্ভুত রহস্য, মেঘ-পাহাড়ের মিতালি আর রোমাঞ্চের আমেজ জেগে ওঠে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত এই পার্বত্য জেলাটি কেবল তার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই অনন্য নয়, বরং এর নামকরণ ঘিরে রয়েছে এক চমৎকার রূপকথা, কিংবদন্তি এবং ভাষাগত বিবর্তনের ইতিহাস। এটি কেবল একটি ভূখণ্ডের নাম নয়; এর গভীরে লুকিয়ে আছে পাহাড়ী জনপদের আদি সংস্কৃতি, ভাষা, প্রকৃতি এবং বন্যপ্রাণীর সাথে মানুষের এক নিবিড় মেলবন্ধনের গল্প।

বান্দরবান জেলার নামকরণ নিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের মারমা, ম্রো ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মাঝে একটি চমৎকার লোকগাথা বা রূপকথা যুগ যুগ ধরে প্রচলিত রয়েছে। এই লোকজ বিশ্বাসটি স্থানীয় মানুষ অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে স্মরণ করে।
বানরের বাঁধ দেওয়ার সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা:
সুদূর অতীতে এই পার্বত্য অঞ্চলটি যখন ঘন অরণ্যে ঘেরা ছিল, তখন এখানে হাজার হাজার বানরের বাস ছিল। পাহাড়ের একটি বিশেষ ছড়া বা খালের পাশে এই বানরগুলো দলবেঁধে থাকত এবং প্রতিদিন ছড়ার ওপারে পাহাড়ের ঢালে লবণাক্ত মাটি (যা স্থানীয়ভাবে নুন-চাটা নামে পরিচিত) খেতে যেত।
একবার বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢল ও প্রবল বৃষ্টির কারণে সেই ছড়ার পানি মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়। তীব্র স্রোতের কারণে বানরের দল আর ছড়া পার হতে পারছিল না। কিন্তু তারা হাল না ছেড়ে এক অভিনব বুদ্ধির আশ্রয় নেয়। বানরগুলো একে অপরের হাত-পা ও লেজ কামড়ে ধরে একটি দীর্ঘ সারিবদ্ধ শৃঙ্খল তৈরি করে। এভাবে তারা নিজেদের শরীর দিয়ে ছড়ার এক পার থেকে অন্য পার পর্যন্ত একটি জীবন্ত সেতু বা বাঁধ নির্মাণ করে এবং পুরো দল নিরাপদে ওপারে চলে যায়।
প্রকৃতির বুকে বানরদের এই বিরল, ঐক্যবদ্ধ ও বিস্ময়কর দৃশ্য দেখে স্থানীয় পাহাড়ী আদিবাসীরা ভীষণভাবে চমৎকৃত হন। এই ঐতিহাসিক ও লোকজ ঘটনার পর থেকেই স্থানটি মারমা ভাষায় পরিচিতি পায় “ম্যাঅকছি ছড়া” নামে।
আমরা আজ সরকারি ও দাপ্তরিকভাবে জেলাটিকে ‘বান্দরবান’ নামে চিনলেও, মারমা জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষায় এর একটি ভিন্ন নাম রয়েছে। মারমা ভাষায় বান্দরবানের স্থানীয় নাম হলো “রদ ক্যওচি ম্রো” (Rhad Kawchi Mroe)। এই নামটিরও একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব রয়েছে, যা মারমা সম্প্রদায়ের আদি পরিচয়ের সাথে মিশে আছে। তবে কালের বিবর্তনে বাংলাভাষী মানুষের আধিক্য ও উচ্চারণের সহজীকরণের কারণে “ম্যাঅকছি” বা বানরের বাঁধের ধারণাটি বাংলায় রূপান্তরিত হয়ে “বান্দরবান” (বান্দর বা বানর + বান বা বাঁধ) রূপ ধারণ করে।
আদিকাল থেকে শুরু করে আধুনিক জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা পর্যন্ত ‘বান্দরবান’ নামটির বিবর্তনকে নিচে একটি ধারাবাহিক কাঠামোর মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
একটি অঞ্চলের নাম কেবল কিছু অক্ষরের সমষ্টি নয়, এটি সেই অঞ্চলের ইতিহাসের দর্পণ। বান্দরবানের নামকরণের এই ইতিহাসটি আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখায়:

সবশেষে বলা যায়, বান্দরবান নামের পেছনের এই লোকগাথা আমাদের এক গর্বিত ঐতিহ্যের গল্প শোনায়। পাহাড়ের চূড়া থেকে বয়ে চলা ঝরনা, সাঙ্গু নদীর কলতান আর আদিবাসীদের মাচাং ঘরের ধোঁয়াটে গন্ধের মতোই এই নামকরণের ইতিহাসটিও রহস্যময় ও সুন্দর। আজ বান্দরবান দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র হলেও, এর নামের পেছনের এই গল্পটি প্রতিটি প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে চিরকাল এক অমলিন স্মারক হিসেবে গেঁথে থাকবে।
মন্তব্য