খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ই জানুয়ারি ২০১৫, ৭:১৫ এএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য চট্টগ্রামের এক অনন্য গিরি জনপদ বান্দরবান। ৪,৪৭৯.০৪ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই বিশাল জেলাটি কেবল তার চোখ জুড়ানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই বিখ্যাত নয়, বরং এর জনসংখ্যাগত পরিকাঠামো এবং বহুজাতিগত সংস্কৃতির সহাবস্থান একে পুরো দেশের মধ্যে অনন্য করে তুলেছে। সমতলের সাধারণ জেলাগুলোর তুলনায় বান্দরবান জেলার জনমিতি, ভাষা ও জীবনযাত্রার ধরণ সম্পূর্ণ আলাদা এবং বৈচিত্র্যময়।
সর্বশেষ জনশুমারি ও সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বান্দরবান পার্বত্য জেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৪,০৪,০৯৩ জন। বিশাল ভৌগোলিক আয়তনের তুলনায় এখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে বেশ কম। পাহাড়ী ভূপ্রকৃতি এবং দুর্গম অঞ্চলের কারণে এখানকার মানুষ মূলত বিভিন্ন ছোট-বড় পাড়া বা গ্রামে পুঞ্জীভূত হয়ে বসবাস করেন।
| সূচক | পরিসংখ্যান |
| মোট জনসংখ্যা | ৪,০৪,০৯৩ জন (আনুমানিক) |
| জেলার মোট আয়তন | ৪,৪৭৯.০৪ বর্গ কিলোমিটার |
| প্রধান প্রশাসনিক সার্কেল | বোমাং সার্কেল |
| নৃগোষ্ঠীর সংখ্যা | ১১টি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী |
বান্দরবানের জনসংখ্যার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এখানকার উপজাতি ও অ-উপজাতি সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। এই জেলায় ১১টি আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ যুগ যুগ ধরে তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রেখেছে।
এখানকার প্রধান প্রধান নৃগোষ্ঠীগুলো হলো:
মারমা ও ম্রো: জেলার আদিবাসী জনসংখ্যার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মারমা সম্প্রদায়। এর পরেই রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ম্রো জনগোষ্ঠী, যারা মূলত পাহাড়ের উঁচুতে বাস করতে পছন্দ করে।
অন্যান্য নৃগোষ্ঠী: তঞ্চঙ্গ্যা, বম, ত্রিপুরা, চাকমা, খিয়াং, খুমি, চাক, লুসাই এবং পাংখোয়া।
প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর রয়েছে আলাদা আলাদা ভাষা, ধর্মীয় আচার, রীতিনীতি, কৃষ্টি এবং সামাজিক জীবনাচার, যা বাংলাদেশের সামগ্রিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে মহামান্বিত ও বৈচিত্র্যময় করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী প্রথাগত রাজপ্রথা এবং প্রতি বছর আয়োজিত হওয়া জাঁকজমকপূর্ণ ‘রাজ পুণ্যাহ’ উৎসব মূলত এই জেলার মারমা রাজবংশ তথা বোমাং সার্কেলকে কেন্দ্র করেই অনুষ্ঠিত হয়।
প্রাচীনকালে এই পার্বত্য অঞ্চলে কোনো স্থায়ী উপজাতীয় বসতি ছিল না এবং এটি প্রাচীন হরিকেল জনপদের অংশ ছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজবংশের ক্ষমতার পালাবদলের মধ্য দিয়ে এখানে ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর আগমন ও স্থায়ী বসবাস শুরু হয়।
৫৯০ খ্রিঃ: পার্বত্য ত্রিপুরা রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা জুযা রূপা আরাকান রাজাকে পরাজিত করে তাঁর দুই ভাই উদয়গিরি কিলাই এবং মংলাইকে এই অঞ্চলে পাঠান। তাঁরা মাতামুহুরী নদীর দক্ষিণে পাহাড়ে বসবাস শুরু করেন।
১৮৮১ ও ১৯০০ সাল: ব্রিটিশ আমলে এই অঞ্চলকে ‘বোমাং সার্কেল’ নামে অভিহিত করা হয় এবং স্থানীয় রাজা, মৌজা হেডম্যান ও কারবারী পদের মাধ্যমে সামাজিক শৃঙ্খলা ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা আজও এখানকার জনমানুষের সামাজিক কাঠামো নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখছে।
১৯৮১ সাল: ১৮ই এপ্রিল বান্দরবান ও লামা মহকুমার সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ জেলা গঠিত হওয়ার পর থেকে সমতলের বাঙালি জনগোষ্ঠীর আগমন ও স্থায়ী আবাসন এই অঞ্চলের জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে নতুন মাত্রা যোগ করে।
১৯৯৭ সাল: ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর এই অঞ্চলের জনসংখ্যার মাঝে শান্তি, সম্প্রীতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও সুদৃঢ় হয়।
এক সময় দুর্গম পাহাড়ী বনাঞ্চল বেষ্টিত ও বিপদসঙ্কুল থাকা বান্দরবান আজ একটি কোলাহলপূর্ণ ও বিকাশমান পর্যটন শহর। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে এখানকার অর্থনৈতিক ধারাতেও বড় পরিবর্তন এসেছে:
পর্যটন-ভিত্তিক জীবিকা: তাজিংডং, কেওক্রাডং, চিম্বুক পাহাড়, বগালেক, প্রান্তিক লেক, মেঘলা, নীলাচল এবং নীলগিরির মতো অপার্থিব সুন্দর পর্যটন কেন্দ্রগুলোর কারণে স্থানীয় জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখন পর্যটন ব্যবসার সাথে সরাসরি যুক্ত।
কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদ: জুম চাষের ঐতিহ্যবাহী বলয় থেকে বেরিয়ে এখানকার জনসংখ্যা এখন পরিকল্পিত বনায়ন, মিশ্র ফল চাষ (আনারস, পাহাড়ি কলা, পেঁপে), চা বাগান এবং পাহাড়ী ঝিরিতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষের মাধ্যমে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলছে।
বান্দরবান জেলাটি অ-উপজাতি ও উপজাতি সম্প্রদায়ের সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। তবে ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং দেশী-বিদেশী পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত সমাগমের কারণে এখানকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য কিছুটা হুমকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে পাহাড়ি ঝিরি, ঝরনা এবং সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি দূষিত হচ্ছে।
উপসংহার: বান্দরবান এক অনন্য গিরি জনপদ। এখানকার জনসংখ্যার এই বৈচিত্র্য এবং পাহাড়ের সরল মানুষের আতিথেয়তাই মূলত পর্যটকদের যুগ যুগ ধরে আকর্ষণ করে আসছে। এই প্রাকৃতিক সম্পদ এবং নৃতাত্ত্বিক ঐতিহ্য রক্ষা করে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারলে বান্দরবান আগামী দিনে দেশের অন্যতম শীর্ষ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঞ্চল হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে।
মন্তব্য