খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই জানুয়ারি ২০১৫, ৬:৩৪ এএম

বান্দরবান কেবল তার আকাশছোঁয়া পাহাড়, মেঘের ভেলা আর রূপবতী ঝরনার জন্যই বিখ্যাত নয়, বরং এখানকার আদিবাসী সমাজ ও পাহাড়ী জনপদের বৈচিত্র্যময় খাবারও বাংলাদেশের ফুড কালচার বা রসনার জগতে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা, ম্রো, খুমি ও খিয়াংসহ প্রায় ১১টি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব রান্নার ধরন, বিশেষ মসলার ব্যবহার এবং শতভাগ অর্গানিক উপাদানের প্রাচুর্য বান্দরবানের খাবারকে করে তুলেছে অনন্য, রোমাঞ্চকর ও স্বাস্থ্যসম্মত।
পাহাড়ের রান্নায় সমতলের মতো অতিরিক্ত তেল বা কৃত্রিম মসলার ব্যবহার নেই বললেই চলে। এখানে পোড়ানো ঘ্রাণ (Smoky Flavor), পাহাড়ি লঙ্কা ও প্রাকৃতিক উপাদানের মেলবন্ধনই মূল আকর্ষণ। বান্দরবান ভ্রমণে গেলে যে ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো আপনার অবশ্যই চেখে দেখা উচিত, তার একটি পূর্ণাঙ্গ গাইড নিচে দেওয়া হলো:

পাহাড়ী জনপদের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী এবং জনপ্রিয় খাবারের নাম হলো বাঁশ কোড়ল বা কচি বাঁশ (স্থানীয় ভাষায় ‘বাজি’)। বর্ষাকালে যখন কচি বাঁশ মাটির নিচ থেকে গজিয়ে ওঠে, তখন সেটি সংগ্রহ করে ভেতরের নরম অংশটি কুচি কুচি করে কেটে এই পদ তৈরি করা হয়।
রান্নার ধরন: এটি সাধারণত পাহাড়ি শুকনো চিংড়ি, কাঁচামরিচ এবং সরিষার তেল দিয়ে ভাজি বা ভর্তা করা হয়। অনেক সময় দেশী মুরগি বা অন্য মাংসের সাথে মিশিয়েও এটি রান্না করা হয়।
স্বাদ: স্বাদে এটি হালকা মিষ্টি ও টক-মিষ্টি ধাঁচের এবং অত্যন্ত সুগন্ধযুক্ত। এটি পরিপাকতন্ত্র ও স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
এটি কোনো সাধারণ চালের ভাত নয়, বরং পাহাড়ের বিশেষ এক জুম চাষের বিন্নি চাল দিয়ে তৈরি আঠালো ভাত। এই ভাত রান্নার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত নান্দনিক এবং আদিম।
রান্নার ধরন: কাঁচা বাঁশের খোলসের ভেতরে ভেজা বিন্নি চাল ভরে কলাপাতা দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর সেই বাঁশটিকে কয়লার আগুনে পুড়িয়ে ভাত রান্না করা হয়।
স্বাদ: বাঁশের ভেতরের প্রাকৃতিক রস ভাতের সাথে মিশে যায় এবং আগুনের তাপে ভাতে একটি চমৎকার ধোঁয়াটে সুগন্ধ (Smoky Flavor) তৈরি হয়। গরম গরম শুঁটকি ভর্তা কিংবা মাংসের ঝোলের সাথে এই বাঁশ ভাত অমৃতের মতো লাগে।
তীব্র ঝাঁঝালো স্বাদ ও গন্ধের জন্য পাহাড়ি ‘নাপ্পি’ এবং শুঁটকি ভর্তা ভীষণ বিখ্যাত। ছোট ছোট চিংড়ি ও মাছ ফার্মেন্টেশন বা বিশেষ প্রক্রিয়ায় পচিয়ে রোদে শুকিয়ে নাপ্পি তৈরি করা হয়, যা মারমা ও অন্যান্য উপজাতির রান্নার অন্যতম প্রধান উপাদান।
বৈশিষ্ট্য: পাহাড়ী লাল মরিচ পুড়ে, আদা, রসুন ও সরিষার তেলের সাথে নাপ্পি বা পাহাড়ি শুঁটকি মিশিয়ে যে ভর্তা তৈরি করা হয়, তা অত্যন্ত সুস্বাদু ও মুখরোচক। সমতলের মানুষের কাছে গন্ধটা শুরুতে তীব্র মনে হলেও এর স্বাদ মুখে লেগে থাকার মতো।
এটি মারমা সম্প্রদায়ের অত্যন্ত পছন্দের একটি ঐতিহ্যবাহী তরকারি। জুমের ক্ষেত থেকে তোলা বিভিন্ন ধরনের টাটকা লতাপাতা, বুনো শাক-সবজি, শুকনো চিংড়ি এবং প্রচুর পরিমাণে পাহাড়ি কাঁচামরিচ দিয়ে এই পদটি তৈরি করা হয়। এই খাবারে তেলের ব্যবহার করা হয় না বললেই চলে। স্বাদে এটি বেশ ঝাল, কিছুটা টক এবং হালকা তেতো অনুভূতির মিশ্রণ।
ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় পাহাড়ের মানুষের শরীরকে উষ্ণ ও চনমনে রাখতে এই স্যুপের জুড়ি নেই। দেশী মুরগির মাংসের ছোট টুকরো, আদা, রসুন, পেঁয়াজ পাতা এবং কচি বাঁশ কোড়ল একসাথে দিয়ে দীর্ঘ সময় ফুটিয়ে এই পাতলা স্যুপ তৈরি করা হয়। এটি স্বাদে কিছুটা ঝাঁঝালো ও অত্যন্ত পুষ্টিকর।
মারমা, ত্রিপুরা ও ম্রো সমাজে বিশেষ উৎসব বা অতিথি আপ্যায়নে শুকরের মাংস (Pork) এবং জুমের দেশী মুরগির মাংস পরিবেশন করা হয়। মাংসগুলোকে হাড়সহ ছোট ছোট টুকরো করে কেটে জুমের লাল মরিচ, আদা, রসুন এবং বিশেষ কিছু পাহাড়ী লতাপাতা (গাছবিচালি) দিয়ে ঘন ঝোল করে রান্না করা হয়। এই রান্নায় কোনো কৃত্রিম গরম মসলা ব্যবহার করা হয় না।
| পদের নাম | মূল উপাদান | স্বাদের ধরন |
| মিক্সড লিফ কারি | মিষ্টি পাতা, শিম পাতা, আলু পাতা ও সাগা পাতা | ভর্তার মতো, সম্পূর্ণ অর্গানিক |
| পাহাড়ি মাছের ঝোল | পাহাড়ি ঝিরি ও সাঙ্গু নদীর তিলা, গজার বা বাইম মাছ | তেল ছাড়া, কাঁচামরিচ ও বাঁশ কোড়লের হালকা ঝোল |
| আঙ্গুই স্যুপ | বিশেষ পাহাড়ী লতা ও ভেষজ পাতা | কড়া স্বাদের ভেষজ স্যুপ, শরীর ঠাণ্ডা রাখে |
| কলার মোচা ও কাঁঠাল বীজ | জুমের কলার মোচা ও পোড়ানো কাঁঠালের বিচি | ঝাল শুঁটকি ও সরিষার তেল দিয়ে মাখানো ভর্তা |
অরগানিক চা ও হ্যান্ডমেড কফি: বান্দরবানের রুমা, চিম্বুক এবং থানচির উঁচুপাহাড়ের ঢালে এখন চা ও কফির চমৎকার খামার গড়ে উঠেছে। এখানকার হাতে তৈরি কফি ও চায়ের স্বাদ অত্যন্ত মৃদু, রিফ্রেশিং এবং কেমিক্যালমুক্ত।
বিন্নি চালের পিঠা ও কেক: জুমের লাল ও কালো বিন্নি চালের গুঁড়ো, তাজা নারকেল এবং পাহাড়ী আখের গুড় দিয়ে এক ধরণের বিশেষ পিঠা বা কেক তৈরি করা হয়। এটি উপজাতীয়দের ঘরে ঘরে সন্ধ্যার নাস্তা হিসেবে বেশ জনপ্রিয়।
১. কোথায় পাবেন: বান্দরবান শহরের ভেতরে এবং রুমা বা থানচি বাজারে এখন বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ী রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে (যেমন: সিস্টেম রেস্তোরাঁ)। যেখানে পর্যটকদের জন্য মানসম্মত উপায়ে এই খাবারগুলো পরিবেশন করা হয়।
২. ঝাল ও মসলা: আপনি যদি অতিরিক্ত ঝাল খেতে না পারেন, তবে অর্ডার করার সময় শেফ বা ওয়েটারকে ঝাল কম দেওয়ার জন্য আগে থেকেই অনুরোধ করে রাখুন।
৩. সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা: পাহাড়ী খাবার চেখে দেখার সময় স্থানীয়দের রন্ধনশৈলী বা উপাদানের প্রতি কোনো ধরণের নেতিবাচক মন্তব্য না করে তাদের খাদ্য সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন।

বান্দরবানের খাবার শুধু পাকস্থলী ভরাবার মাধ্যম নয়, এটি পাহাড়ের মানুষের শত বছরের ঐতিহ্য, জীবন সংগ্রাম এবং প্রকৃতির সাথে মিতালির এক অপূর্ব প্রতিচ্ছবি। আপনার পরবর্তী বান্দরবান ট্রিপে পাহাড়ের মেঘ-কুয়াশা দেখার পাশাপাশি পাহাড়ী রান্নাঘরের ধোঁয়াটে ঘ্রাণে হারিয়ে যেতে এবং এই বৈচিত্র্যময় স্বাদের অভিজ্ঞতা নিতে একদম ভুলবেন না!
মন্তব্য