খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জানুয়ারি ২০১৫, ৬:৪০ এএম

পার্বত্য চট্টগ্রামের নৈসর্গিক রূপসী জেলা বান্দরবান কেবল তার আকাশছোঁয়া পাহাড় আর মেঘের ভেলার জন্যই দেশ-বিদেশে পরিচিত নয়; বরং এই মাটির কিছু কৃতি সন্তান বাংলাদেশের ইতিহাস, রাজনীতি, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ক্রীড়াঙ্গনে অনন্য অবদান রেখে গেছেন। তাঁদের মেধা, ত্যাগ এবং নেতৃত্ব শুধু বান্দরবান জেলাকেই গর্বিত করেনি, বরং গোটা বাংলাদেশের বুকে এই পাহাড়ি জনপদের নাম উজ্জ্বল করেছে। এই নিবন্ধে আমরা বান্দরবানের এমনই তিনজন বিশিষ্ট ব্যক্তির জীবন, সংগ্রাম ও জাতীয় পর্যায়ে তাঁদের গৌরবময় অর্জনের কথা জানব।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ স্বাধীনতার জন্য জীবনপণ লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদেরই একজন ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের গর্বিত বীর সন্তান ইউ. কে. চিং। একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য হয়েও বাংলা মায়ের টানে তিনি অস্ত্র হাতে তুলে নেন এবং বাঙালি ভাইদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেন।
মুক্তিযুদ্ধে অবদান: তৎকালীন ইপিআর (বর্তমানে বিজিবি)-এর সদস্য হিসেবে ইউ. কে. চিং ১৯৭১ সালে ৮ নম্বর সেক্টরের অধীনে সম্মুখ সমরে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আধুনিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করে তিনি নিজ ব্যাটালিয়নের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি: মুক্তিযুদ্ধে তাঁর এই অসামান্য সাহসিকতা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে রাষ্ট্রীয় ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে ভূষিত করে। মহান মুক্তিযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তিনি ছিলেন একমাত্র আদিবাসী বীর, যা তাঁকে বান্দরবান তথা বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।

বান্দরবান জেলার আধুনিক রূপান্তর এবং পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রীতির রাজনীতির বরপুত্র বলা হয় বীর বাহাদুর উশৈসিং-কে। ১৯৬০ সালের ১০ জানুয়ারি বান্দরবান সদরের এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করা এই নেতা ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সাথে যুক্ত হন।
শিক্ষা ও রাজনৈতিক উত্থান: বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।
পার্বত্য শান্তি চুক্তি ও উন্নয়ন: ১৯৯৭ সালে ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তি চুক্তির আলোচনায় তিনি ছিলেন সরকারের প্রতিনিধি দলের অন্যতম প্রধান ও নির্ভরযোগ্য সদস্য। তিনি দুই মেয়াদে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব (উপমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায়) পালন করেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বেই পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও যোগাযোগ খাতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়।
সংসদীয় রাজনীতি ও মন্ত্রিত্ব: বীর বাহাদুর উশৈসিং ১৯৯১ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর তিনি টানা ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করেন। তিনি জাতীয় সংসদের হুইপ, প্যানেল স্পিকারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ২০১৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং ২০১৯ সালে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন।
ক্রীড়া ও সমাজসেবা: রাজনীতির বাইরেও তিনি ১৯৯৮-২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং বাংলাদেশ ফুটবল রেফারি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০০০ সালের অলিম্পিক গেমসে তিনি বাংলাদেশের ‘চিফ অব দ্য মিশন’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে যে কজন তরুণ প্রতিভা দূর পার্বত্য অঞ্চল থেকে উঠে এসে জাতীয় পর্যায়ে চমক দেখিয়েছেন, ফুটবলার জাফর ইকবাল তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৯৯ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বান্দরবানে জন্মগ্রহণ করা এই ফুটবলার মূলত আক্রমণভাগের (Forward) খেলোয়াড়।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার: বাঁ পায়ের দুর্দান্ত ড্রিবলিং, গতি ও স্কিলের কারণে খুব অল্প বয়সেই তিনি ফুটবল বোদ্ধাদের নজরে আসেন। ২০১৬ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের লাল-সবুজ জার্সি গায়ে তাঁর অভিষেক ঘটে। ভারতের বিপক্ষে অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে অভিষেক ম্যাচেই গোল করার কৃতিত্ব দেখান তিনি। এরপর ২০১৮ সালে লাওসের বিপক্ষে জাতীয় সিনিয়র দলের হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করেন।
ক্লাব ফুটবল: ঘরোয়া ফুটবল লীগে তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্লাব যেমন—আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ, চট্টগ্রাম আবাহনী, সাইফ স্পোর্টিং ক্লাব এবং ঐতিহ্যবাহী ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে উইঙ্গার হিসেবে মাঠ কাঁপিয়েছেন। তাঁর এই উত্থান বান্দরবানের বর্তমান যুবসমাজের জন্য ক্রীড়াঙ্গনে এগিয়ে যাওয়ার এক বড় অনুপ্রেরণা।
বান্দরবান জেলার এই বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের জীবন আমাদের শেখায় যে—ভৌগোলিক দুর্গমতা কিংবা সামাজিক সীমাবদ্ধতা কোনো কিছুই মানুষের স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হতে পারে না। একদিকে ইউ. কে. চিং-এর দেশপ্রেম ও সাহসিকতা, অন্যদিকে বীর বাহাদুর উশৈসিং-এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও উন্নয়নমুখী নেতৃত্ব এবং মাঠ কাঁপানো ফুটবলার জাফর ইকবালের ক্রীড়াশৈলী—এই তিন দিক বান্দরবানের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক প্রজ্বলিত পথরেখা হিসেবে কাজ করছে।

বান্দরবান কেবল একটি পর্যটন এলাকা নয়, এটি দেশের গৌরবময় কৃতি সন্তানদেরও চারণভূমি। এই কৃতি সন্তানদের আদর্শকে ধারণ করে বান্দরবানের তরুণ সমাজ আগামী দিনে বাংলাদেশকে আরও সমৃদ্ধ ও উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।
মন্তব্য