খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই এপ্রিল ২০০০, ৭:১৭ পিএম

বাংলাদেশের মানুষের কাছে অ্যাডভেঞ্চার, পাহাড় আর মেঘের অনন্য এক মিতালির নাম রুমা। বান্দরবান জেলার এই উপজেলাটি কেবল একটি প্রশাসনিক অঞ্চলই নয়, এটি ট্র্যাকার, পাহাড়প্রেমী এবং প্রকৃতি সন্ধানীদের জন্য এক চিরকালীন বিস্ময়। দেশের সর্বোচ্চ পাহাড়ী চূড়াগুলোর বেশিরভাগই এই অঞ্চলে অবস্থিত। সাঙ্গু নদীর খরস্রোতা রূপ, পাহাড়ের ঢালে মেঘে ঢাকা পাড়া আর বহুজাতিগত সংস্কৃতির সরল আতিথেয়তা রুমা উপজেলাকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
রুমা উপজেলার মোট আয়তন প্রায় ৪৯২.১০ বর্গ কিলোমিটার। ভৌগোলিক মানচিত্রে এই অঞ্চলটি ২১°৫৩´ থেকে ২২°১০´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২°১৭´ থেকে ৯২°৩৪´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থান করছে।
এর সীমানা বিন্যাস দেশের পার্বত্য অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট গঠন করেছে:
উত্তরে: রোয়াংছড়ি উপজেলা
দক্ষিণে: থানচি উপজেলা (যার সাথে রুমার পাহাড়ী ট্রেইল যুক্ত)
পূর্বে: রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলা এবং ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত
পশ্চিমে: বান্দরবান সদর উপজেলা ও লামা উপজেলা
রুমা উপজেলার বুক চিরে বয়ে গেছে রূপালী সাঙ্গু নদী। পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে আসা নদীটি এখানে বেশ খরস্রোতা। বর্ষাকালে নদীটি যেমন ভয়ঙ্কর সুন্দর রূপ ধারণ করে, শীতকালে এর শান্ত স্নিগ্ধ রূপ পর্যটকদের মুগ্ধ করে। এছাড়া বগাছড়ি, রেমাক্রী ছড়া ও রাইক্ষ্যং খালের মতো অসংখ্য ঝিরি এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও পানির মূল উৎস।
পার্বত্য অঞ্চলের শাসন ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা জোরদার করতে ১৯৭৬ সালে রুমা থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে, ১৯৮৩ সালে স্থানীয় মানুষের প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য এটিকে পূর্ণাঙ্গ উপজেলায় রূপান্তর করা হয়। ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় এই উপজেলাটি মাত্র ৪টি প্রধান ইউনিয়নে বিভক্ত।
ইউনিয়নগুলো হলো:
১. রুমা সদর ইউনিয়ন
২. পাইন্দু ইউনিয়ন
৩. গ্যালেংগ্যা ইউনিয়ন
৪. রেমেকপ্রু ইউনিয়ন
এই ইউনিয়নগুলো মূলত পাহাড়ের চূড়ায় ও ঢালে অবস্থিত শত শত পাড়ায় বিন্যস্ত। প্রতিটি পাড়ার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা কারবারী এবং হেডম্যানদের প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
সবশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রুমা উপজেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩০,০০০ জনের কাছাকাছি। পাহাড়ী জনপদ হওয়ায় এখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যন্ত কম। এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ের পাড়ার দূরত্ব অনেক সময় মাইলের পর মাইল হয়ে থাকে।
রুমায় বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষ পরম সহনশীলতায় নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব পালন করেন। এখানকার ধর্মীয় জনসংখ্যার বিন্যাস নিম্নরূপ:
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী: জনসংখ্যার প্রায় ৪৫%
খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী: প্রায় ৪০% (বিশেষ করে বম ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষ খ্রিস্টধর্ম পালন করেন)
মুসলিম, হিন্দু ও অন্যান্য আদিম প্রকৃতিপূজারী: বাকি ১৫%
রুমা উপজেলাকে নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক রাজধানী বলা চলে। এখানে মারমা, ম্রো, ত্রিপুরা, বম, খিয়াং, খুমি এবং চাকমা সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করেন। বিশেষ করে বম ও ম্রোদের ঐতিহ্যবাহী উৎসব, বাঁশ নৃত্য এবং বোনা রঙিন পোশাক রুমার সংস্কৃতিকে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় করেছে। জুম কাটার পর তাদের ঐতিহ্যবাহী উৎসবগুলো দেখার মতো অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
দুর্গম পাহাড়ী যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে রুমা উপজেলায় শিক্ষার প্রসার বেশ ধীরগতির। এখানকার গড় সাক্ষরতার হার প্রায় ২৮.৯%। তবে ইদানীং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
উপজেলার শিক্ষা বিস্তারে কাজ করছে:
উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ: ১টি (রুমা সরকারি কলেজ)
মাধ্যমিক বিদ্যালয়: ৫টি
প্রাথমিক বিদ্যালয়: প্রায় ৬০টি
প্রত্যন্ত পাহাড়ী পাড়া থেকে প্রতিদিন পায়ে হেঁটে স্কুলে আসা শিশুদের জন্য এক বড় পরীক্ষা। এই সংকট দূর করতে খ্রিষ্টান মিশনারি স্কুল এবং বৌদ্ধ বিহারের অবৈতনিক আবাসিক হোস্টেলগুলো বড় ভূমিকা রাখছে।
ভৌগোলিক দুর্গমতার কারণে রুমা উপজেলার স্বাস্থ্য খাত এখনও বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত পাড়াগুলো থেকে হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে তাকে ঝুড়িতে করে বা হেঁটে সদর হাসপাতালে নিয়ে আসতে হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ১টি
ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র: ২টি
কমিউনিটি ক্লিনিক: ৫টি
পশু চিকিৎসা কেন্দ্র: ১টি
উপজেলার প্রত্যন্ত পাড়াগুলোতে আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা খুবই সীমিত। মাত্র ১৫.৪% পরিবার স্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিন ব্যবহার করে। অন্যদিকে, সুপেয় পানির জন্য উপজেলার প্রায় ৯৫% মানুষ প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে আসা সুপেয় ঝিরির জল বা ঝরনার পানি তারা বাঁশের চোঙা বা পাইপের মাধ্যমে পাড়ায় নিয়ে আসে, যা ‘ঝিরির পানি’ নামে পরিচিত।
রুমা উপজেলার মূল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হলো জুম চাষ এবং উদ্যান কৃষি (ফল চাষ)। সমতল জমি না থাকায় পাহাড়ের খাঁড়া ঢালই এখানকার মানুষের অন্নসংস্থানের একমাত্র উৎস।
পাহাড়ের ঢালে প্রথাগত জুম পদ্ধতিতে জুমের ধান, ভুট্টা, মারফা, আদা, হলুদ ও তুলা চাষ করা হয়। রুমার জুমের চালের চমৎকার স্বাদ ও পুষ্টিগুণের জন্য বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
রুমা উপজেলার আবহাওয়া ফল চাষের জন্য অমৃত। এখানকার উৎপাদিত প্রধান ফলসমূহ হলো:
মিষ্টি কমলা ও মাল্টা (রুমার কমলা সারা দেশে বিখ্যাত)
পাহাড়ী চম্পা কলা ও আনারস
কাজু বাদাম ও কফি (যা বর্তমানে স্থানীয়দের অর্থনৈতিক ভাগ্য বদলে দিচ্ছে)
রুমার গভীর অরণ্য থেকে প্রচুর পরিমাণে বাঁশ, বেত ও মূল্যবান কাঠ সংগৃহীত হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে।
এক সময় বান্দরবান সদর থেকে রুমায় যাতায়াত ছিল অত্যন্ত কঠিন ও দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। তবে বর্তমান সময়ে সড়ক যোগাযোগের অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে।
প্রধান সড়ক: বান্দরবান-রুমা সড়ক। এই আঁকাবাঁকা ও রোমাঞ্চকর পথ ধরে জিপ বা চাঁদের গাড়িতে করে রুমায় পৌঁছানো যায়।
অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ: সদর থেকে বগালেক বা কেওক্রাডং যাওয়ার জন্য পাহাড়ী পথ তৈরি হয়েছে। তবে বর্ষাকালে অনেক পাহাড়ি রাস্তা ধসে বা পিছল হয়ে যাওয়ায় যাতায়াত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন পায়ে হেঁটে ট্র্যাকিং করাই একমাত্র উপায়।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই জনপদে সব ধর্মের মানুষের জন্যই উপাসনালয় রয়েছে:
বৌদ্ধ বিহার (ক্যাঙ) ও প্যাগোডা: ৩০টির বেশি
গীর্জা (চার্চ): ২৫টির মতো (বম পাড়াগুলোতে সুদৃশ্য গীর্জা দেখা যায়)
মসজিদ ও মন্দির: বেশ কয়েকটি
বাংলাদেশের ট্র্যাকিং এবং পাহাড়ী পর্যটনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো রুমা। দেশের সবচেয়ে বিখ্যাত কিছু ট্রেইল এবং পাহাড়ী বিস্ময় এখানে অবস্থিত।
উল্লেখযোগ্য আকর্ষণসমূহ:
বগালেক (বগাকাইন হ্রদ): সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,২০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত একটি প্রাকৃতিক হ্রদ। মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে সৃষ্ট এই লেকের নীল জল এবং চারপাশের বম পাড়ার দৃশ্য পর্যটকদের কাছে এক পরাবাস্তব অভিজ্ঞতা।
কেওক্রাডং চূড়া: এক সময়ের অফিশিয়াল স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ (উচ্চতা প্রায় ৩,২৩৫ ফুট)। এই চূড়ায় ওঠার ট্রেইলটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর এবং চূড়া থেকে মেঘের সমুদ্র দেখার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
তাজিংডং চূড়া: বাংলাদেশের অন্যতম সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ (বিজয় নামেও পরিচিত), যা রুমার গভীর অঞ্চলে অবস্থিত।
ঋজুক ঝরনা: সাঙ্গু নদীর পাড়ে অবস্থিত একটি সুবিশাল প্রাকৃতিক ঝরনা। নদী দিয়ে নৌকা করে যাওয়ার সময় এই ঝরনার পানি সরাসরি সাঙ্গু নদীতে এসে পড়ার দৃশ্য অপার্থিব সৌন্দর্য তৈরি করে।
রুমা উপজেলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের ইকো-ট্যুরিজমের এক বিশাল দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। তবে এই অঞ্চলের প্রকৃতির আদিমতা রক্ষা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে কিছু উদ্যোগ প্রয়োজন:
১. পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থাপনা: বগালেক বা কেওক্রাডং ট্রেইলে পর্যটকদের প্লাস্টিক ও বর্জ্য ফেলা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং পরিবেশের ক্ষতি না করে পর্যটন পরিচালনা করা।
২. কমলা ও কাজু বাদাম সংরক্ষণাগার: রুমার বিখ্যাত কমলা এবং কাজু বাদাম যাতে নষ্ট না হয়, সেজন্য স্থানীয় পর্যায়ে হিমাগার বা প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা।
৩. দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সেবা: জিপিএস বা মোবাইল নেটওয়ার্কের উন্নয়ন ঘটিয়ে দুর্গম পাড়াগুলোর সাথে মূল প্রশাসনিক কেন্দ্রের যোগাযোগ আরও সহজ করা।
আকাশছোঁয়া পাহাড়, রহস্যময় বগালেক, খরস্রোতা সাঙ্গু আর আদিবাসী মানুষের সরল জীবনবোধের এক জীবন্ত উপাখ্যান হলো রুমা উপজেলা। প্রকৃতির এই অনন্য সৃষ্টিকে রক্ষা করে টেকসই উন্নয়ন করতে পারলে এটি চিরকাল বাংলাদেশের পর্যটনের মুকুট হয়ে থাকবে।
মন্তব্য