খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই এপ্রিল ২০০০, ৭:৯ পিএম

বাংলাদেশের মানচিত্রে যদি এমন কোনো জায়গার নাম বলতে হয় যা একাধারে রহস্যময়, রোমাঞ্চকর এবং আদিম প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্যে মোড়ানো—তবে সবার আগে আসবে থানচির নাম। বান্দরবান জেলার এই উপজেলাটি কেবল একটি প্রশাসনিক অঞ্চল নয়, এটি বাংলাদেশের অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য। মেঘের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া রাস্তা, রূপালী সাঙ্গু নদীর অবিরাম বয়ে চলা আর পাহাড়ী জাতিগোষ্ঠীর সরল জীবনযাত্রা থানচিকে করেছে অনন্য।

থানচি উপজেলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর আয়তন। প্রায় ১,০২০.৮২ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই উপজেলাটি বান্দরবান জেলার সর্ববৃহৎ উপজেলা হিসেবে পরিচিত। ভৌগোলিক মানচিত্রে এর অবস্থান ২১°১৫´ থেকে ২১°৫৭´ উত্তর অক্ষাংশ এবং লাম্বায় ৯২°২০´ থেকে ৯২°৪১´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে।
এর সীমানা বিন্যাস দেশের মানচিত্রে অত্যন্ত কৌশলগত ও আকর্ষণীয়:
থানচির বুক চিরে, কখনো শান্ত, কখনো উথাল-পাথাল গতিতে বয়ে গেছে সাঙ্গু নদী। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘শঙ্খনদী’ নামেও পরিচিত। পাহাড়ের গভীর থেকে নেমে আসা এই নদীটিই এখানকার যোগাযোগের মূল ধমনী এবং জীবিকার প্রধান উৎস।

পার্বত্য অঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক তদারকি জোরদার করতে ১৯৭৬ সালে থানচি থানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে, ১৯৮৩ সালে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উন্নয়নে এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ উপজেলায় রূপান্তর করা হয়। দুর্গম পাহাড়ী এলাকা হওয়ার কারণে এই সুবিশাল উপজেলাটি মাত্র ৪টি প্রধান ইউনিয়নে বিভক্ত, তবে আয়তনের দিক থেকে প্রতিটি ইউনিয়নই বিশাল।
উপজেলার প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু। সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী এই সদর এলাকাই পর্যটকদের মূল ট্রানজিট পয়েন্ট।
থানচি ঢোকার মুখেই এই সমতল ও পাহাড়ের মিশ্রণে গড়া অঞ্চলটি অবস্থিত, যা অর্থনৈতিকভাবে বেশ সচল।
ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক স্বপ্নের নাম। সাঙ্গু নদীর তীরে বড় বড় পাথরের মেলা (বড় পাথর এলাকা) এই ইউনিয়নের অন্যতম মূল আকর্ষণ।
বাংলাদেশের অন্যতম দুর্গম কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর ইউনিয়ন। জলপ্রপাতের স্বর্গরাজ্য নাফাকুম, অমিয়াকুমের মতো স্থানগুলো এই রেমাক্রীর গভীর অরণ্যেই লুকিয়ে আছে।

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, থানচি উপজেলার মোট জনসংখ্যা ২৩,৫৯১ জন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ১২,৩৪৪ জন এবং নারীর সংখ্যা ১১,১৪৭ জন। বিশাল আয়তনের তুলনায় এখানকার জনসংখ্যা বেশ কম, যার ফলে জনবসতিগুলো বেশ ছড়ানো-ছিটানো (পাহাড়ের ভাষায় যাকে ‘পাড়া’ বলা হয়)।
থানচি ধর্মীয় এবং জাতিগত সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। এখানে বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষ নিজ নিজ ঐতিহ্য বজায় রেখে শান্তিতে বসবাস করছেন:
থানচির আসল প্রাণ লুকিয়ে আছে এর নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যে। এখানে মারমা, ম্রো (মুরং), ত্রিপুরা, খুমি, খ্যাং এবং বম সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করেন। পাহাড়ের চূড়ায় মাচাং ঘর তৈরি করে প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকার এই মানবিক গল্পগুলো অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ী।

ভৌগোলিক দুর্গমতা এবং পাড়াগুলোর একটি থেকে অন্যটির দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় থানচিতে শিক্ষার বিস্তার বেশ ধীরগতির। এখানে গড় সাক্ষরতার হার ২৬.৯%।
বর্তমানে এই বিশাল অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে:
মাধ্যমিক বিদ্যালয়: ১টি
নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়: ২টি
প্রাথমিক বিদ্যালয়: ১৭টি
দুর্গম অঞ্চলের শিশুদের জন্য অনেক সময় এই স্কুলগুলোও নাগালের বাইরে চলে যায়। তবে ইদানীং বিভিন্ন মিশন, এনজিও এবং সরকারি উদ্যোগে পাড়াভিত্তিক ‘কমিউনিটি স্কুল’ বা ‘হোস্টেল’ ব্যবস্থা চালু হওয়ায় পাহাড়ী শিশুরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে।

থানচির স্বাস্থ্য খাত এখনও ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতার সাথে লড়াই করছে। প্রত্যন্ত পাহাড়ী পাড়া থেকে একজন মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে আসা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ১টি
পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র: ১টি
কমিউনিটি ক্লিনিক: ৩টি
পশু চিকিৎসা কেন্দ্র: ২টি
পাহাড়ের কঠিন পাথুরে মাটির কারণে এখানে আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা বেশ কঠিন:
স্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিন ব্যবহারকারী: মাত্র ২.২৫% পরিবার
অস্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিন ব্যবহারকারী: ৪৩.২০% পরিবার
ল্যাট্রিন সুবিধা বহির্ভূত পরিবার: ৫৪.৫৫% (এঁরা মূলত উন্মুক্ত পাহাড়ী প্রকৃতি বা ছড়ার ওপর নির্ভরশীল)
পানীয় জলের ক্ষেত্রেও নলকূপের সুবিধা মাত্র ৭.০৫% মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে এবং ট্যাপের জল পান করেন মাত্র ০.১২%। এছাড়া সামান্য কিছু পরিবার পুকুরের পানি (১.৫১%) ব্যবহার করলেও, জনসংখ্যার সিংহভাগ অর্থাৎ ৯১.৩২% মানুষ পাহাড়ের প্রবহমান ছড়া, ঝরনা এবং সাঙ্গু নদীর সুপেয় ‘ঝিরির জল’ পান করে জীবনধারণ করেন।
থানচির অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। এখানকার মানুষ শত শত বছর ধরে তাদের পূর্বপুরুষদের শেখানো পদ্ধতিতে জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।
পাহাড়ের ঢালে ঢালে আগুন দিয়ে জমি পরিষ্কার করে এখানে ‘জুম চাষ’ করা হয়। একটি মাত্র জুমের জমিতে একসাথে ধান, তিল, ভুট্টা, আলু, আদা এবং হলুদ চাষ করা হয়। এখানকার জুমের চাল এবং পাহাড়ী আদা-হলুদ সারা দেশে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
থানচির আবহাওয়া ফল চাষের জন্য অমৃত। এখানকার প্রধান ফলগুলো হলো:
মিষ্টি কমলা ও মাল্টা
পাহাড়ী চম্পা ও সবরি কলা
রসালো কাঁঠাল
কাজু বাদাম (বর্তমানে থানচির কাজু বাদাম দেশের বাইরেও রপ্তানি হচ্ছে এবং এটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে)
প্রকৃতির অকৃপণ দানে সমৃদ্ধ থানচির বনাঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমাণে বাঁশ, বেত এবং মূল্যবান কাঠ পাওয়া যায়। এছাড়া সাঙ্গু নদীর তলদেশে থাকা পাহাড়ি পাথর স্থানীয় নির্মাণশিল্পের একটি বড় উৎস।
এক সময় থানচি ছিল দেশের অন্যতম বিচ্ছিন্ন অঞ্চল। তবে বান্দরবান-থানচি সড়ক নির্মাণের পর এই চিত্র বদলে গেছে। এই সড়কটির একটি বড় অংশ মেঘের বুক চিরে চলে গেছে, যা দেশের সবচেয়ে উঁচু সড়কপথ হিসেবে পরিচিত।
প্রধান বাহন: চাকার গাড়ির মধ্যে ‘চাঁদের গাড়ি’ (জিপ) এবং লোকাল বাস এই অঞ্চলের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম।
নৌপথ: বর্ষাকালে বা দুর্গম রেমাক্রী-তিন্দুতে যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম হলো ইঞ্জিনচালিত বিশেষ সরু নৌকা। সাঙ্গুর পাথুরে বাঁকে বাঁকে নৌকা চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর।
এখানে প্রতিটি জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মের মানুষ যাতে স্বাধীনভাবে তাদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করতে পারে, তার জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত উপাসনালয়:
বৌদ্ধ বিহার (ক্যাঙ): ৩১টি
গীর্জা (চার্চ): ২৯টি (পাহাড়ের বম ও ত্রিপুরাদের অনেকেই খ্রিস্টধর্মাবলম্বী)
মসজিদ: ৩টি
মন্দির: ২টি
can দেশের পর্যটন মানচিত্রে থানচিকে বলা হয় ‘অ্যাডভেঞ্চারের রাজধানী’। আকাশছোঁয়া পাহাড় আর মেঘের খেলা দেখতে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক এখানে ছুটে আসেন।
উল্লেখযোগ্য পাহাড় ও চূড়া:
সাঙ্গু নদী ধরে নৌকায় উজান পানে গেলে দেখা মেলে রেমাক্রী খালের। এই খালের পানি যেখানে সাঙ্গুতে এসে পড়েছে, সেখানে তৈরি হয়েছে রেমাক্রী ফলস। এর আরও গভীরে গেলে দেখা মেলে নাফাকুম ও অমিয়াকুমের মতো অবিশ্বাস্য সুন্দর সব জলপ্রপাতের, যা পর্যটকদের মুগ্ধতার শেষ সীমানায় নিয়ে যায়।
থানচি যেমন সৌন্দর্যের খনি, তেমনই এর সাধারণ মানুষের জীবন এখনো বেশ কঠিন। এই অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের জন্য কিছু বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি:
১. ইকো-ট্যুরিজম: পাহাড় এবং আদিবাসীদের সংস্কৃতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
২. কাজু বাদাম ও কফি প্রক্রিয়াজাতকরণ: স্থানীয়ভাবে কাজু বাদাম ও কফি প্রক্রিয়াজাতকরণের কারখানা করলে জুমচাষীদের ভাগ্য বদলে যাবে।
৩. ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা: দুর্গম পাড়াগুলোর জন্য হেলিকপ্টার ইমার্জেন্সি বা নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের সুবিধা আরও জোরদার করা।
প্রকৃতির রুদ্ররূপ আর স্নিগ্ধতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন এই থানচি। এখানকার পাহাড়ী মানুষের সরল হাসি আর সাঙ্গুর কলতান বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য গৌরবের আসনে বসিয়েছে।
মন্তব্য