খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ই জানুয়ারি ২০১৫, ১০:০ এএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত ৪,৪৭৯.০৩ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের অনন্য পার্বত্য জেলা বান্দরবান। প্রায় ৪,৮১,১০৯ জন মানুষের এই জনপদটি কেবল তার আকাশছোঁয়া পাহাড় বা মেঘের ভেলার জন্যই দেশ-বিদেশে পরিচিত নয়, বরং এর আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এখানকার বহুবর্ণিল ও বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মাঝে। বান্দরবান হলো এমন এক অনন্য সাংস্কৃতিক চারণভূমি, যেখানে যুগ যুগ ধরে পাহাড়ি ও সমতলের মানুষের মাঝে এক অভূতপূর্ব সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রয়েছে।
বান্দরবান বাংলাদেশের একমাত্র জেলা যেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্পূর্ণ নিজস্ব ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বজায় রেখে একসাথে শান্তিতে বসবাস করছে। এই জাতিগোষ্ঠীগুলো হলো:
মারমা, ম্রো এবং ত্রিপুরা
বম, তঞ্চঙ্গ্যা এবং চাকমা
চাক, খেয়াং এবং খুমী
লুসাই এবং পাংখোয়া
এই বহুজাতিক ও বহু-ধর্মীয় (বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, সনাতন ও প্রকৃতি পূজারী) সহাবস্থান বান্দরবানের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে করেছে অসম্ভব রকমের বৈচিত্র্যময়। প্রতিটি জাতির রয়েছে আলাদা সামাজিক কাঠামো, জন্ম-মৃত্যু ও বিয়ের নিজস্ব আচার এবং সম্পূর্ণ স্বকীয় পোশাক ও ভাষা। এই বৈচিত্র্যের মেলবন্ধন বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতিকে করেছে আরও বেশি সমৃদ্ধ ও গৌরবময়।
পাহাড়ের এই বিলুপ্তপ্রায় ভাষা, কৃষ্টি ও লোকসংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে টিকিয়ে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে বান্দরবানে কাজ করছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট।
পটভূমি ও বিকাশ: ১৯৭৮ সালে প্রথমে রাঙ্গামাটিতে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হলেও, পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে এটিকে বান্দরবানে স্থানান্তরিত করা হয় এবং পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম শুরু হয়।
অবকাঠামো ও গবেষণা: বর্তমানে এই ইনস্টিটিউটের অধীনে একটি সমৃদ্ধ নৃগোষ্ঠী জাদুঘর, লাইব্রেরি, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মিলনায়তন ও গবেষণা সেল রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়মিত আদিবাসী ভাষা শিক্ষা, ঐতিহ্যবাহী নৃত্য-সংগীতের প্রশিক্ষণ এবং হারিয়ে যাওয়া লোকগাথা সংরক্ষণের কাজ অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
বান্দরবানের সংস্কৃতির সবচেয়ে প্রাণবন্ত রূপ দেখা যায় এখানকার উৎসবগুলোর সময়ে। ১১টি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব অসংখ্য উৎসবের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং বর্ণাঢ্য উৎসব হলো মারমা সম্প্রদায়ের ‘সাংগ্রাই’ (যা সমতলে বিজু, বৈসুক বা বৈসাবি নামেও পরিচিত)।
জল উৎসব বা পানি খেলা: নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার এই উৎসবে পাহাড়ের তরুণ-তরুণীরা একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে পুরোনো বছরের সমস্ত জরাজীর্ণতা ও দুঃখ ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে।
সাংস্কৃতিক শোভাযাত্রা: উৎসবের দিনগুলোতে বান্দরবানের প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর মানুষ তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী কোমর তাঁতে বোনা পোশাক (যেমন: থামি, পিনন-হাদি) পরে, ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের সুর ও তালের সঙ্গে আনন্দঘন পরিবেশে শহরের প্রধান প্রধান সড়কে শোভাযাত্রা বের করে। পুরো বান্দরবান শহর তখন যেন এক রঙের উৎসবে রূপ নেয়।
বান্দরবানের অনন্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য—যেমন দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ তাজিংডং ও কেওক্রাডং, রহস্যময় চিম্বুক পাহাড়, অলৌকিক বগালেক, কিংবা মেঘের বাড়ি নীলগিরি ও নীলাচল—এখানকার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
পাহাড়ের চূড়ায় ম্রো বা বমদের মাচাং ঘর, জুমের ক্ষেতে তরুণীদের গান গেয়ে ফসল তোলা এবং সাঙ্গু নদীর শান্ত বুকে মারমা মাঝিদের নৌকা চালানো—এই সবই বান্দরবানের প্রকৃতির সাথে সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিথস্ক্রিয়া। দেশ-বিদেশের পর্যটকরা কেবল পাহাড় দেখতে বান্দরবান আসেন না, তাঁরা আসেন এই বৈচিত্র্যময় পাহাড়ি জীবনধারা এবং তাদের সরল ও অতিথিপরায়ণ সংস্কৃতিকে খুব কাছ থেকে অনুভব করতে।

বান্দরবান জেলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল মূলত বহুমাত্রিক সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এখানে যুগের পর যুগ ধরে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, তাদের নিজস্ব কৃষ্টির লালন এবং প্রকৃতির সাথে মানুষের মিতালী এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এই অনন্য লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের চলমান উদ্যোগগুলো যদি আরও জোরদার করা যায়, তবে বান্দরবানের এই বহুবর্ণিল সংস্কৃতি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের এক অনন্য ব্রান্ডিং হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য