খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই জুলাই ২০২৬, ৪:৪৩ পিএম

বান্দরবানের দুর্গম থানচি উপজেলার নাফাখুম জলপ্রপাত এলাকায় বেড়াতে গিয়ে এক টানা প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে আটকা পড়েছিলেন ৬৯ জন পর্যটক। তাঁদের সঙ্গে থাকা আরও ১০ জন ট্যুরিস্ট গাইডও প্রতিকূল আবহাওয়ার শিকার হন। দুর্গম ওই এলাকায় এক রাত কাটিয়ে তাঁরা অবশেষে কাছের রেমাক্রি ইউনিয়নের একটি নিরাপদ স্থানে পৌঁছাতে সক্ষম হলেও, যোগাযোগ ব্যবস্থার অবনতি ও নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এখনো জেলা সদরে ফিরতে পারেননি। তবে আটকে পড়া পর্যটক ও তাঁদের সঙ্গীরা সবাই সুস্থ আছেন বলে প্রশাসন নিশ্চিত করেছে।
থানচি উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল সোমবার সকালে মোট ৭৯ জন পর্যটক ও গাইড থানচি থেকে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র নাফাখুমের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। আকস্মিক ও অতি ভারী বর্ষণে পরিস্থিতি এতটাই প্রতিকূল হয়ে ওঠে যে, তাঁরা আর ফিরতে পারেননি। অবশেষে, আজ মঙ্গলবার সকালে তাঁরা স্থানীয় গাইডদের সহায়তায় হেঁটে রেমাক্রি ইউনিয়নে পৌঁছান। থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আবদুল আল ফয়সাল এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পর্যটক ও গাইডরা বর্তমানে রেমাক্রিতে নিরাপদে আছেন। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাঁদের সেখান থেকে লোকালয়ের দিকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে।
বান্দরবান আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এই পরিমাণ বৃষ্টিকে ‘অতি ভারী বৃষ্টি’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়, যা সাধারণত পাহাড়ি অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়। আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সনাতন কুমার মণ্ডল জানান, আজ সকাল ৯টা পর্যন্ত এই ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তিনি আরও সতর্ক করেছেন যে, আগামীকাল বুধবার পর্যন্ত অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে এবং সামগ্রিকভাবে বৃষ্টি ১১ জুলাই পর্যন্ত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এমন অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের কারণে বান্দরবানের পাহাড়ি ঝিরি, ঝরনা এবং ছোট-বড় নদীগুলোর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি চলে এসেছে, যা অসংখ্য পাহাড়ি ঢলের সৃষ্টি করেছে। এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে, প্রশাসন গতকাল রাতে এক জরুরি ঘোষণায় বান্দরবান জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র প্রথমে ১০ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করে। প্রতিকূল আবহাওয়া অব্যাহত থাকায়, পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এ নিষেধাজ্ঞা অন্তত আগামী শুক্রবার পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। একই সঙ্গে এই সময়ে পর্যটকদের যেকোনো ধরনের ভ্রমণের ওপরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত জলপ্রপাত নাফাখুমের অবস্থান বান্দরবান সদর থেকে প্রায় ১১৮ কিলোমিটার দূরে। এই মনোমুগ্ধকর পর্যটনকেন্দ্রে যেতে প্রথমে দীর্ঘ নদীপথ এবং তারপর কয়েক ঘণ্টা দুর্গম পাহাড়ি পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিতে হয়। বর্ষাকালে, বিশেষ করে অতি বৃষ্টির সময়, এই পথ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। পাহাড়ি ঢলের কারণে চলার পথ পিচ্ছিল এবং বিপজ্জনক হয়ে যায়, যা পর্যটকদের জন্য চরম দুর্ভোগ ডেকে আনে।
থানচি উপজেলা প্রশাসন আটকে পড়া পর্যটকদের সহায়তার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। লাইফজ্যাকেটসহ একটি উদ্ধারকারী দল রেমাক্রির দিকে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় গাইড এবং আটকে পড়া পর্যটকদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যে, পানি ও বৃষ্টি না কমা পর্যন্ত কোনো অবস্থাতেই ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে চলাচল করা যাবে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য। এমতাবস্থায়, পর্যটকদের প্রতি অনুরোধ জানানো হচ্ছে তারা যেন আবহাওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত যেকোনো ধরনের ভ্রমণ থেকে বিরত থাকেন এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলেন।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য