খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই এপ্রিল ২০০০, ৭:১৪ পিএম

পার্বত্য বান্দরবান জেলার প্রবেশদ্বার এবং এক অনন্য প্রাকৃতিক উপত্যকার নাম লামা। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সমতল ভূমির সীমান্ত ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলটি পাহাড়ী সংস্কৃতির বৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। পাহাড়ে ঘেরা শান্ত পরিবেশ, আঁকাবাঁকা মাতামুহুরী নদীর রূপালী জলধারা আর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর শত বছরের সহাবস্থান লামা উপজেলাকে বাংলাদেশের অন্যতম এক সম্ভাবনাময় অঞ্চলে পরিণত করেছে।
লামা উপজেলার মোট আয়তন প্রায় ৬৭১.৮৪ বর্গ কিলোমিটার। ভৌগোলিক মানচিত্রে এটি ২১°৩৬´ থেকে ২১°৫৯´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২°০৪´ থেকে ৯২°২৩´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থান করছে।
এর সীমানা বিন্যাস এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও যাতায়াত ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে:
লামা উপজেলার বুক চিরে প্রবহমান প্রধান নদী হলো মাতামুহুরী। এই নদীটি কেবল এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই বাড়িয়ে দেয়নি, বরং স্থানীয় কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রধান ধমনী হিসেবে কাজ করছে। বর্ষায় এই নদীর রূপ যেমন যৌবনা হয়ে ওঠে, শীতের দিনে তেমনই শান্ত ও স্নিগ্ধ রূপ ধারণ করে।
লামা থানা মূলত ব্রিটিশ আমলে ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে এবং স্থানীয় মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে ১৯৮৫ সালে এটিকে পূর্ণাঙ্গ উপজেলায় রূপান্তর করা হয়। বর্তমানে ১টি পৌরসভা এবং ৭টি প্রধান ইউনিয়ন নিয়ে এই প্রশাসনিক কাঠামো গঠিত।
ইউনিয়নগুলো হলো:
১. লামা সদর ইউনিয়ন
২. ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন
৩. আজিজনগর ইউনিয়ন
৪. সরই ইউনিয়ন
৫. গজালিয়া ইউনিয়ন
৬. রূপসীপাড়া ইউনিয়ন
৭. ফাইতং ইউনিয়ন
পৌরসভা ও ইউনিয়নগুলো আবার নিজস্ব মৌজা এবং অসংখ্য ছায়াঢাকা পাহাড়ী গ্রামে বিভক্ত, যা স্থানীয় ভাষায় ‘পাড়া’ নামে পরিচিত।
সর্বশেষ প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, লামা উপজেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ১,১০,০০০ জনের কাছাকাছি। এই জনপদে নারী ও পুরুষের অনুপাত প্রায় সমান।
লামা অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষ অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করেন। এখানকার ধর্মীয় জনসংখ্যার বিন্যাস নিম্নরূপ:
লামা উপজেলার আসল সৌন্দর্য এখানকার সামাজিক গঠনে। এখানে বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি মারমা, ম্রো (মুরং), ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা এবং চাকমা সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা ও উৎসবকে টিকিয়ে রেখেছেন। এই বহুজাতির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান পুরো অঞ্চলে এক অনন্য সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তৈরি করেছে।
লামা উপজেলায় শিক্ষার হার সমতলের চেয়ে কিছুটা কম হলেও দিন দিন তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে এখানকার গড় সাক্ষরতার হার প্রায় ৩৪%। দুর্গম পাহাড়ী পাড়াগুলোতে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হলেও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
উপজেলার শিক্ষা বিস্তারে কাজ করে যাচ্ছে:
এছাড়াও দুর্গম পাড়ার শিশুদের জন্য বিভিন্ন খ্রিষ্টান মিশন ও বৌদ্ধ বিহারের উদ্যোগে আবাসিক হোস্টেল বা পাড়া কেন্দ্র পরিচালিত হয়, যা ঝরে পড়া রোধে বড় ভূমিকা রাখছে।
ভৌগোলিক দুর্গমতার কারণে প্রত্যন্ত পাড়ার মানুষের জন্য উন্নত চিকিৎসা পাওয়া কিছুটা কষ্টসাধ্য হলেও লামা সদরে স্বাস্থ্যসেবার সুব্যবস্থা রয়েছে।
উপজেলার সমতল ও আধা-সমতল এলাকায় স্যানিটেশন ব্যবস্থা বেশ উন্নত হলেও উঁচুতে অবস্থিত পাহাড়ী পাড়াগুলোতে এখনও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রায় ৩৫% পরিবার স্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিন ব্যবহার করে। অন্যদিকে, সুপেয় পানীয় জলের জন্য উপজেলার প্রায় ৬০% মানুষ নলকূপের ওপর নির্ভরশীল। তবে দুর্গম এলাকার মানুষ এখনও ঝরনা, ছড়া বা মাতামুহুরী নদীর ঝিরির পানি সংগ্রহ করে জীবনধারণ করেন।
লামা উপজেলার অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। সমতল ভূমিতে আধুনিক চাষাবাদ হলেও পাহাড়ের ঢালে এখনও আদিম ও ঐতিহ্যবাহী জুম চাষের রাজত্ব।
পাহাড়ী জনগোষ্ঠী জুম পদ্ধতিতে একই জমিতে ধান, ভুট্টা, মারফা (পাহাড়ী শসা), তিল, আদা ও হলুদ চাষ করেন। এছাড়া সমতল এলাকায় প্রচুর পরিমাণে আমন ও বোরো ধান এবং শীতকালীন শাকসবজি উৎপাদিত হয়।
লামার মাটি ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উর্বর। এখানকার উৎপাদিত প্রধান ফলসমূহ হলো:
তবে এই অঞ্চলে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হলেও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর তামাক চাষের একটি বড় প্রবণতা রয়েছে। মাতামুহুরী নদীর দুই কূলে শীতকালে ব্যাপক তামাক চাষ হতে দেখা যায়।
লামার বনাঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ বাঁশ, বেত ও মূল্যবান কাঠ (যেমন সেগুন, গামারি) সংগৃহীত হয়। কুটিরশিল্পের মধ্যে আদিবাসীদের কোমর তাঁতে বোনা কাপড়, বাঁশ ও বেতের তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র স্থানীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে।
বান্দরবানের অন্যান্য দুর্গম উপজেলার তুলনায় লামার যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ উন্নত। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া অংশ থেকে লামা সদরে প্রবেশের পিচঢালা সড়কটি বেশ চওড়া ও সুগম।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যবাহী এই উপজেলায় সব ধর্মের মানুষের জন্যই পর্যাপ্ত উপাসনালয় রয়েছে:
লামা উপজেলাটি তার প্রাকৃতিক নৈসর্গিকতার কারণে দিন দিন পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এখানকার পাহাড় ও নদীর মিতালি দেখার মতো।
উল্লেখযোগ্য আকর্ষণসমূহ:
লামা উপজেলার ভৌগোলিক অবস্থান এবং উর্বর ভূমি একে এক সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলেছে। তবে এর টেকসই উন্নয়নের জন্য কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন:
১. পরিবেশবান্ধব কৃষি: তামাক চাষের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মাটি ও নদীকে রক্ষা করতে কৃষকদের ফল ও মসলা চাষে উৎসাহিত করা।
২. ইকো-ট্যুরিজম ও হোম-স্টে: মিরিঞ্জা ও কোয়ান্টাম সংলগ্ন এলাকায় স্থানীয় সংস্কৃতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে পরিবেশবান্ধব পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটানো।
৩. দুর্গম অঞ্চলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রসার: রূপসীপাড়া বা গজালিয়ার মতো দূরবর্তী ইউনিয়নগুলোর মানুষের কাছে মোবাইল ক্লিনিক এবং শিক্ষার আলো পৌঁছানো।
প্রকৃতির সবুজ আঁচল আর মাতামুহুরীর কলতানে মুখরিত লামা উপজেলা পার্বত্য চট্টগ্রামের এক শান্ত, স্নিগ্ধ এবং সম্ভাবনাময় জনপদ, যা তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলেছে সমৃদ্ধির পথে।
মন্তব্য