খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই এপ্রিল ২০০০, ৭:১৫ পিএম

পার্বত্য বান্দরবান জেলার মধ্য-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত রোয়াংছড়ি উপজেলা প্রকৃতিপ্রেমী এবং ট্র্যাকারদের কাছে এক পরম বিস্ময়ের নাম। গহীন অরণ্য, আকাশছোঁয়া পাহাড়ী চূড়া, উপত্যকা বেয়ে নেমে আসা অসংখ্য রূপালী ঝরনা আর আদিবাসী সংস্কৃতির আদিম সরলতা এই অঞ্চলকে এক রহস্যময় মায়াপুরীতে রূপান্তর করেছে। বান্দরবান সদর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হলেও এই উপজেলার ভেতরের ভূপ্রকৃতি এবং জনজীবন সমতলের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
রোয়াংছড়ি উপজেলার মোট আয়তন প্রায় ৪৪২.৬৪ বর্গ কিলোমিটার। ভৌগোলিক মানচিত্রে এই অঞ্চলটি ২২°০৩´ থেকে ২২°২০´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২°১৪´ থেকে ৯২°৩০´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থান করছে।
এর সীমানা বিন্যাস প্রাকৃতিক এবং প্রশাসনিকভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ:
উত্তরে: রাঙ্গামাটি জেলার রাজস্থলী ও বিলাইছড়ি উপজেলা
দক্ষিণে: রুমা উপজেলা (যা পাহাড়ী ট্রেইলের জন্য বিখ্যাত)
পূর্বে: রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলা এবং ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন পাহাড়ী অঞ্চল
পশ্চিমে: বান্দরবান সদর উপজেলা
এই উপজেলার অন্যতম প্রধান নদী হলো তারাছা খাল। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা এই পাহাড়ি খালটি সাঙ্গু নদীর সাথে গিয়ে মিশেছে। বর্ষাকালে এই খালের স্রোত যেমন ভয়ঙ্কর রূপ নেয়, শুকনো মরসুমে এর স্বচ্ছ জলধারা এবং পাথুরে তলদেশ তেমনই চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য বিলিয়ে দেয়। এছাড়া অসংখ্য ছোট-বড় ঝিরি ও ছড়া এই অঞ্চলের পানির প্রধান উৎস।
পাহাড়ী অঞ্চলের সুশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি তদারকি করার জন্য ১৯৭৬ সালে রোয়াংছড়ি থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে, স্থানীয় প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের অংশ হিসেবে ১৯৮৩ সালে এটিকে পূর্ণাঙ্গ উপজেলায় রূপান্তর করা হয়। ভৌগোলিকভাবে দুর্গম এবং জনবসতি ছড়ানো-ছিটানো হওয়ায় এই উপজেলাটি মাত্র ৪টি প্রধান ইউনিয়নে বিভক্ত।
ইউনিয়নগুলো হলো:
১. রোয়াংছড়ি সদর ইউনিয়ন
২. তারাছা ইউনিয়ন
৩. আলেক্ষ্যং ইউনিয়ন
৪. নোয়াপতং ইউনিয়ন
এই ইউনিয়নগুলো আবার অসংখ্য পাহাড়ী পাড়ায় বিভক্ত, যেখানে কারবারী (পাড়া প্রধান) এবং হেডম্যানদের (মৌজা প্রধান) মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী সমাজ ব্যবস্থা পরিচালিত হয়।
সবশেষ প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রোয়াংছড়ি উপজেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ২৮,০০০ জনের কাছাকাছি। এখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশ কম, যার মূল কারণ উচুঁ-নিচু পাহাড়ী ভূপ্রকৃতি।
রোয়াংছড়িতে বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষ যুগ যুগ ধরে কোনো ধরণের সংঘাত ছাড়াই বসবাস করছেন। এখানকার ধর্মীয় বিন্যাস নিম্নরূপ:
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী: জনসংখ্যার প্রায় ৬০%
খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী: প্রায় ২৫%
মুসলিম ও হিন্দু ধর্মাবলম্বী: বাকি ১৫%
রোয়াংছড়িকে আদিবাসী সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র বলা যায়। এখানে মারমা, ম্রো (মুরং), ত্রিপুরা, বম এবং তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করেন। বিশেষ করে বম ও ম্রো সম্প্রদায়ের মানুষের ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা এবং উৎসবগুলো এই অঞ্চলের প্রধান সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। আদিবাসীদের বোনা রঙিন পোশাক, ঐতিহ্যবাহী বাঁশের নৃত্য এবং জুম উৎসবের গান এই জনপদকে উৎসবমুখর করে রাখে।
ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে রোয়াংছড়ি উপজেলায় শিক্ষার প্রসার কিছুটা ধীরগতির। এখানকার গড় সাক্ষরতার হার প্রায় ২৩.৯%, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশ কম। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষার হার দ্রুত বাড়ছে।
উপজেলায় শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে:
উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ: ১টি (রোয়াংছড়ি কলেজ)
মাধ্যমিক বিদ্যালয়: ৫টি
প্রাথমিক বিদ্যালয়: প্রায় ৫০টি
দুর্গম পাহাড়ী পাড়াগুলোতে শিক্ষকদের উপস্থিতি এবং যাতায়াত ব্যবস্থা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে খ্রিষ্টান মিশনারি স্কুল এবং স্থানীয় বৌদ্ধ বিহারগুলো (ক্যাঙ) অবৈতনিক শিক্ষার মাধ্যমে পাহাড়ী শিশুদের জ্ঞান বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত পাড়াগুলো থেকে জরুরি রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে আসা রোয়াংছড়ির অন্যতম প্রধান মানবিক সমস্যা। বর্ষাকালে এই সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ১টি
ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র: ২টি
কমিউনিটি ক্লিনিক: ৪টি
পশু চিকিৎসা কেন্দ্র: ১টি
উপজেলার নোয়াপতং ও আলেক্ষ্যং ইউনিয়নের প্রত্যন্ত পাড়াগুলোতে স্যানিটেশন ব্যবস্থা এখনও বেশ দুর্বল। মাত্র ১০.৫% পরিবার স্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিন ব্যবহার করে। সুপেয় পানির জন্য এখানকার ৯০%-এর বেশি মানুষ সম্পূর্ণভাবে পাহাড়ী ঝিরি ও ঝরনার পানির ওপর নির্ভরশীল। ঝিরির পানি পানের কারণে বর্ষাকালে জলবাহিত রোগব্যাধির প্রকোপ দেখা যায়, যা দূর করতে মোবাইল মেডিকেল টিমের তৎপরতা বাড়ানো প্রয়োজন।
রোয়াংছড়ির অর্থনৈতিক ভিত্তি মূলত জুম চাষ এবং বনজ সম্পদ আহরণ। সমতল ভূমি না থাকায় এখানকার মানুষ পাহাড়ের ঢালকেই তাদের জীবিকার প্রধান মাধ্যম বানিয়ে নিয়েছেন।
পাহাড়ের ঢালে প্রথাগত জুম পদ্ধতিতে এখানকার মানুষ জুমের ধান, তুলা, মারফা, আদা ও হলুদ চাষ করেন। রোয়াংছড়ির জুমের আদা ও হলুদের মান চমৎকার হওয়ায় এর বাণিজ্যিক চাহিদা রয়েছে। এছাড়াও এখানে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হয়:
পাহাড়ী চম্পা কলা ও রসালো আনারস
পেঁপে ও কাঁঠাল
কাজু বাদাম ও কফি (যা বর্তমানে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করছে)
উপজেলার বনাঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমাণে বাঁশ ও বেত সংগৃহীত হয়, যা দিয়ে স্থানীয়রা চমৎকার হস্তশিল্প তৈরি করেন। এছাড়া পাহাড়ি ছড়াগুলো থেকে উত্তোলিত পাথর স্থানীয় নির্মাণকাজে ব্যবহৃত হয়।
বান্দরবান সদর থেকে রোয়াংছড়ি সদরের সড়ক যোগাযোগ বেশ চমৎকার। আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথ ধরে জিপ বা সিএনজিতে করে খুব সহজেই সদরে পৌঁছানো যায়।
প্রধান সড়ক: বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়ক।
অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ: সদর থেকে ভেতরের ইউনিয়ন বা পাড়াগুলোতে যাওয়ার কোনো পাকা রাস্তা নেই। সেখানে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হলো ট্র্যাকিং (পায়ে হাঁটা) অথবা শুষ্ক মরসুমে মোটরসাইকেল। বর্ষাকালে নদী ও ছড়াগুলোর পানি বেড়ে গেলে অনেক পাড়া সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এখানে প্রতিটি সম্প্রদায় তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা উপভোগ করে। উপজেলায় রয়েছে:
বৌদ্ধ বিহার (ক্যাঙ): ২৫টির বেশি
গীর্জা (চার্চ): ২০টির মতো
মসজিদ ও মন্দির: বেশ কয়েকটি
অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকদের কাছে রোয়াংছড়ি এক রোমাঞ্চকর নাম। বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর ও বিপজ্জনক কিছু ঝরনা এবং ট্রেইল এই উপজেলাতেই অবস্থিত।
উল্লেখযোগ্য আকর্ষণসমূহ:
দেবতাকুম: পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত একটি গভীর এবং শান্ত জলের গর্ত বা কুম। খাড়া পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বাঁশের ভেলায় করে দেবতাকুমে যাওয়ার অভিজ্ঞতা পর্যটকদের কাছে এক অবিশ্বাস্য রোমাঞ্চ।
শিলোপী ঝরনা ও রনিন পাড়া: পাহাড়ী ট্র্যাকিংয়ের জন্য বিখ্যাত এই রনিন পাড়া বম সম্প্রদায়ের একটি সুশৃঙ্খল গ্রাম। এখান থেকে বিভিন্ন দুর্গম ঝরনায় যাওয়ার ট্রেইল শুরু হয়।
তিনাপ সাইতার: বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও সুন্দর জলপ্রপাতগুলোর একটি, যা রোয়াংছড়ির গভীর অরণ্যে লুকিয়ে আছে। এখানে পৌঁছাতে দীর্ঘ পথ পায়ে হাঁটতে হয়।
তারাছা খালের পাড়: নদীর শান্ত রূপ এবং চারপাশের খাড়া পাহাড়ের দৃশ্য যেকোনো মানুষের মন ভালো করে দেয়।
রোয়াংছড়ি উপজেলাকে যদি সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা যায়, তবে এটি দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন ও কৃষি হাবে পরিণত হতে পারে। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদী কিছু পদক্ষেপ প্রয়োজন:
১. নিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন: দেবতাকুম ও তিনাপ সাইতারের মতো স্পর্শকাতর প্রাকৃতিক স্থানগুলোকে প্লাস্টিক ও পরিবেশ দূষণ থেকে রক্ষা করে ইকো-ট্যুরিজম মডেল চালু করা।
২. ক্যাশ ক্রপ বা অর্থকরী ফসল চাষ: জুম চাষের পাশাপাশি স্থানীয় জুমচাষীদের কাজু বাদাম ও কফি চাষের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও ঋণ সুবিধা দেওয়া।
৩. পাড়াভিত্তিক সুপেয় পানির ব্যবস্থা: রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং এবং ছড়ার পানি ফিল্টার করার ছোট ছোট প্ল্যান্ট স্থাপন করে দুর্গম পাড়ার মানুষের সুপেয় পানির নিশ্চয়তা দেওয়া।
সবুজ পাহাড়ের নীরবতা, আদিবাসী মানুষের সরল আতিথেয়তা আর রূপালী ঝরনার কলতানে মুখরিত রোয়াংছড়ি উপজেলা বাংলাদেশের এক অমূল্য প্রাকৃতিক রত্ন, যার সঠিক বিকাশ এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রাকে বদলে দিতে পারে।
মন্তব্য