খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই জানুয়ারি ২০১৫, ৬:১৪ এএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রামের এক অনন্য এবং জাদুকরী জনপদ বান্দরবান। উঁচু-নিচু পাহাড়ের সারি, ঘন সবুজ অরণ্য আর মেঘের আনাগোনার আড়ালে লুকিয়ে আছে এই অঞ্চলের এক দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর ইতিহাস। ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিচিত্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি এবং প্রাচীন কিংবদন্তির এক অপূর্ব মিশেলে গড়ে উঠেছে আজকের বান্দরবান। এটি কেবল মানচিত্রের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল নয়, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা রাজন্য শাসন, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং প্রকৃতির সাথে মানুষের মিতালির এক জীবন্ত মহাকাব্য।

বান্দরবান নামের পেছনে কোনো শুষ্ক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং জড়িয়ে আছে পাহাড়ী অঞ্চলের এক অদ্ভুত সুন্দর লোকগাথা। জনশ্রুতি রয়েছে, বহু বছর আগে এই অঞ্চলের পাহাড়ী অরণ্যে অগণিত বানর বাস করত। পাহাড়ের পাদদেশে বয়ে চলা এক ছড়ার পাড়ে এই বানরের দল প্রতিদিন নুন খেতে আসত।
একবার বর্ষাকালে পাহাড়ী ঢলের কারণে ছড়ার পানি ভয়ানকভাবে বেড়ে যায়। ওপাড়ে যাওয়ার কোনো উপায় না দেখে বানরের দল এক অপূর্ব বুদ্ধির পরিচয় দেয়। তারা একে অপরের হাত, পা ও লেজ ধরে একটি সারিবদ্ধ মানববন্ধনের মতো ‘বানরের সেতু’ তৈরি করে ছড়াটি পার হতে শুরু করে। পাহাড়ের সরল মানুষরা বানরদের এই অদ্ভুত ও অভূতপূর্ব একতা দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যান।
মারমা ভাষায় এই ছড়াটির নাম দেওয়া হয় ‘ম্যাঅকছি ছড়া’। মারমা শব্দ ‘ম্যাঅক’ অর্থ বানর এবং ‘ছি’ শব্দের অর্থ হচ্ছে বাঁধ। অর্থাৎ, বানরদের দেওয়া বাঁধ বা সেতু। কালের বিবর্তনে এবং বাংলা ভাষাভাষী মানুষের উচ্চারণে এই ‘ম্যাঅকছি ছড়া’ বা বানরের বাঁধ থেকেই অঞ্চলটির নাম রূপান্তরিত হয় “বান্দরবান”-এ। বর্তমানে সরকারি দলিলপত্রে এই নামটি স্থায়ী রূপ নিলেও, মারমা আদিবাসীদের মুখে আজও এই অঞ্চলের নাম ‘রদ ক্যওচি ম্রো’।
আজকের যে শান্ত ও স্নিগ্ধ বান্দরবান আমরা দেখি, মধ্যযুগে তা ছিল অত্যন্ত অশান্ত এবং বিভিন্ন পরাক্রমশালী রাজবংশের রণক্ষেত্র। ১৫৫০ সালে অঙ্কিত বাংলার প্রথম মানচিত্রেই এই দুর্গম অঞ্চলের অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, তারও প্রায় ৬০০ বছর আগে থেকে এই অঞ্চলে ক্ষমতার পালাবদল শুরু হয়েছিল।
পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারের সেই দীর্ঘ ইতিহাসকে প্রধান কয়েকটি পর্যায়ক্রমে দেখা যায়:
৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দ (আরাকানি আধিপত্য): আরাকানের শক্তিশালী রাজা এই অঞ্চলটি প্রথম আক্রমণ করে নিজের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। এর ফলে এই অঞ্চলে প্রথম বারের মতো মঘ বা মারমা সংস্কৃতির প্রভাব পড়তে শুরু করে।
১২৪০ খ্রিষ্টাব্দ (ত্রিপুরার রাজত্ব): উত্তরে অবস্থিত ত্রিপুরার মহারাজা এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব বুঝতে পেরে সামরিক অভিযান চালান এবং আরাকানিদের হটিয়ে এলাকা দখল করেন।
১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দ (আরাকানের পুনঃআক্রমণ): আরাকান রাজ পরিবার দমে যায়নি। তারা আবার সংগঠিত হয়ে পাহাড়ি জনপদে আক্রমণ চালায় এবং রুমাসহ বান্দরবানের বেশ কিছু অংশ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দ (মুঘল সাম্রাজ্যের ছোঁয়া): সুবেদার শায়েস্তা খাঁর আমলে মুঘলরা যখন চট্টগ্রাম জয় করে, তখন এই পাহাড়ী অঞ্চলের ওপরও মুঘলদের পরোক্ষ করদ রাজ্যের প্রভাব তৈরি হয়।
১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দ (ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমন): নবাব মীর কাশিম আলী খানের কাছ থেকে বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রামের শাসনভার নেওয়ার পর ব্রিটিশদের নজর পড়ে এই দুর্গম পাহাড়ে।
১৮৬০ সালে ব্রিটিশ সরকার এই অঞ্চলটিকে সরাসরি ব্রিটিশ ভারতের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে এবং একে ‘চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস’ বা পার্বত্য চট্টগ্রাম নামে একটি স্বাধীন প্রশাসনিক জেলা হিসেবে রূপান্তর করে। শুরুতে এটি চট্টগ্রাম জেলা কালেক্টরেটের অধীনস্থ ছিল।
পাহাড়ী মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতি ও প্রাচীন শাসন ব্যবস্থাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে ব্রিটিশ সরকার ১৯০০ সালে একটি ঐতিহাসিক আইন পাস করে, যা ‘হিল ট্র্যাক্টস ম্যানুয়াল’ বা ‘১৯০০ সালের রেগুলেশন’ নামে পরিচিত। এই আইনের অধীনে পুরো পার্বত্য অঞ্চলকে তিনটি প্রধান রাজস্ব ও প্রশাসনিক সার্কেলে বিভক্ত করা হয়:
১. চাকমা সার্কেল (রাঙ্গামাটি কেন্দ্রিক)
২. মং সার্কেল (খাগড়াছড়ি কেন্দ্রিক)
৩. বোমাং সার্কেল (বান্দরবান কেন্দ্রিক)
বান্দরবান ছিল ঐতিহাসিক বোমাং সার্কেলের মূল কেন্দ্র। এই সার্কেলের প্রথাগত শাসন ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বভার দেওয়া হয় ঐতিহ্যবাহী বোমাং রাজপরিবারের হাতে, যারা ষোড়শ শতাব্দী থেকেই আরাকানি ঐতিহ্যের ধারা বেয়ে এই অঞ্চল শাসন করে আসছিল। বোমাং রাজাদের অনন্য শাসন ব্যবস্থার কারণে এই পুরো অঞ্চলের আদি নাম ছিল ‘বোমাং থং’ বা বোমাং রাজার দেশ।
নিচে একটি কালপঞ্জির মাধ্যমে ৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শুরু করে ১৯৮১ সালে পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে বান্দরবানের আত্মপ্রকাশের ঐতিহাসিক পথপরিক্রমা তুলে ধরা হলো:
বান্দরবান জেলার অভ্যুদয়ের এই দীর্ঘ গল্পটি কেবল কিছু সাল কিংবা প্রশাসনিক ভাঙা-গড়ার ইতিহাস নয়। এটি একটি অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব সত্তা ও বর্ণাঢ্য সংস্কৃতির টিকে থাকার লড়াই।
আজকের স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের মানচিত্রে বান্দরবান তার নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে অনন্য:
নৃগোষ্ঠীগত বৈচিত্র্যের মিলনমেলা: মারমা, ম্রো, ত্রিপুরা, বম, খুমি, খিয়াং, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যাসহ প্রায় ১১টি ভিন্ন ভাষার নৃগোষ্ঠীর শত বছরের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চারণভূমি এই জেলা।
ঐতিহ্যবাহী রাজতন্ত্রের সহাবস্থান: আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতরেও এখানে বোমাং রাজার ঐতিহ্যবাহী রাজপুণ্যাহ (রাজস্ব আদায়ের উৎসব) এবং হেডম্যান-কারবারী প্রথা আজও সগৌরবে টিকে আছে।
প্রকৃতির আদিম রূপ: এই প্রশাসনিক অভ্যুদয়ের ফলেই বগালেক, কেওক্রাডং, কিংবা নাফাকুমের মতো দুর্গম ও আদিম প্রাকৃতিক স্থানগুলো আজ বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের মুকুট হয়ে উঠেছে।
উপসংহারে বলা যায়, প্রাচীন আরাকান ও ত্রিপুরার রাজন্য রাজত্ব, মুঘল ও ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক নীতি এবং স্থানীয় বোমাং রাজতন্ত্রের এক দীর্ঘ ও অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতাই আজকের বান্দরবানকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বর্ণাঢ্য এবং সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির জনপদে পরিণত করেছে।
মন্তব্য