খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই এপ্রিল ২০০০, ৭:১৮ পিএম

বান্দরবান জেলাকে বলা হয় রূপসী বাংলার প্রাকৃতিক রূপকথা, আর সেই রূপকথার প্রধান প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু হলো বান্দরবান সদর উপজেলা। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক এলাকা নয়, বরং পার্বত্য চট্টগ্রামের বহুজাতিগত সংস্কৃতি, অবারিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের এক বিস্ময়কর প্রবেশদ্বার। সমতল আর পাহাড়ের এক অপূর্ব মিতালি এই অঞ্চলটিকে দেশের মানুষের কাছে চিরকালের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

বান্দরবান সদর উপজেলার মোট আয়তন ৫০১.৯৯ বর্গ কিলোমিটার। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী এটি ২১°৫৫´ থেকে ২২°২২´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২°০৮´ থেকে ৯২°২০´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত।
এর চারপাশের সীমানা বিন্যাস এই অঞ্চলের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে:
উত্তরে: রাঙ্গামাটি জেলার রাজস্থলী উপজেলা
দক্ষিণে: লামা উপজেলা
পূর্বে: রোয়াংছড়ি উপজেলা ও রুমা উপজেলা
পশ্চিমে: চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলা
এই উপজেলার ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। মারমিয়ানা তাং এবং বথিল তাং পাহাড়ের মতো উঁচু চূড়া এবং বেশ কয়েকটি মনোহরী পাহাড়ী ঝরনা এই অঞ্চলের সৌন্দর্যকে জীবন্ত করে তুলেছে। আর এই পুরো জনপদের বুক চিরে প্রবহমান প্রধান জলাশয় হলো সাঙ্গু নদী, যা এখানকার মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রধান উৎস।

ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটিশ আমলে ১৯২৩ সালে বান্দরবান সদর থানা গঠিত হয়েছিল। পরবর্তীতে, প্রশাসনিক কাজের পরিধি বৃদ্ধি এবং স্থানীয় মানুষের সুবিধার্থে ১৯৮৪ সালে এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ উপজেলায় উন্নীত করা হয়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই অঞ্চলটি ১ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল। যুদ্ধকালীন সময়ে পাকবাহিনী এই এলাকার নিরীহ মানুষের ওপর নির্মম নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং গণহত্যা চালিয়েছিল। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের স্মৃতিকে ধরে রাখতে এখানে একটি মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে, যা আজও সেই গৌরবময় ও বেদনাবিধুর ইতিহাসের নীরব প্রহরী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

২০২৫ সালের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবান সদর উপজেলার মোট জনসংখ্যা ৬৮,৬৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৩৯,০২৬ জন এবং নারীর সংখ্যা ২৯,৬৬৭ জন।
এই উপজেলাটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ পরম সম্প্রীতিতে একসাথে বসবাস করেন। ধর্মীয় জনসংখ্যার বিন্যাস নিম্নরূপ:
খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী: ২৯,৩৬৫ জন
মুসলিম ধর্মাবলম্বী: ২৯,১৮৫ জন
হিন্দু ধর্মাবলম্বী: ৫,৩২৯ জন
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী: ৩,০৭৪ জন
অন্যান্য আদিম প্রকৃতিপূজারী: ১,৭৪০ জন
এই ধর্মীয় বৈচিত্র্যের পাশাপাশি এখানে মারমা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, চাকমাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বাস করেন। তাদের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা এবং উৎসবসমূহ এই অঞ্চলের সামাজিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করেছে।

বান্দরবান সদর উপজেলায় শিক্ষার হার জেলার অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে তুলনামূলকভাবে ভালো। এখানে গড় শিক্ষার হার ৪৩.২%। তবে লিঙ্গভেদে শিক্ষার হারে কিছুটা তারতম্য রয়েছে; পুরুষদের মধ্যে শিক্ষার হার ৫০.৩% এবং নারীদের মধ্যে এই হার ৩৩.৪%।
উপজেলায় শিক্ষার আলো ছড়াতে কাজ করে যাচ্ছে একঝাঁক মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান:
কলেজ: ২টি
কারিগরি কলেজ: ১টি
মাধ্যমিক বিদ্যালয়: ১৫টি
প্রাথমিক বিদ্যালয়: ৬৬টি
মাদ্রাসা: ২টি
উল্লেখযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে রয়েছে বান্দরবান টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ, বান্দরবান ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ, বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় এবং সাঙ্গু উচ্চ বিদ্যালয়।
এখানে প্রতিটি ধর্মের মানুষ যাতে স্বাধীনভাবে তাদের উৎসব ও আচার অনুষ্ঠান পালন করতে পারে, তার জন্য পর্যাপ্ত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। উপজেলায় উপাসনালয়ের সংখ্যা:
মসজিদ: ১০১টি
কেয়াং (বৌদ্ধ মন্দির): ৭০টি
গীর্জা: ২২টি
হিন্দু মন্দির: ১০টি
আশ্রম ও মঠ: যথাক্রমে ৩টি ও ২টি
পবিত্র তীর্থস্থান: ১টি
সদর উপজেলাটি পাহাড়ী সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এখানে রয়েছে ১টি ঐতিহ্যবাহী উপজাতীয় সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট, ১টি শিল্পকলা একাডেমি, ১টি শিশু একাডেমি, ২টি পাবলিক লাইব্রেরি, ২টি আধুনিক অডিটোরিয়াম, ১৮টি প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং ৭৬টি মহিলা সংগঠন।
বান্দরবান সদর উপজেলার অর্থনৈতিক ভিত্তি মূলত কৃষি ও ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। এখানকার মানুষের আয়ের প্রধান উৎসসমূহ হলো:
কৃষি ও জুম চাষ: ৪৭.০১%
চাকরি: ১৬.০১%
ব্যবসা-বাণিজ্য: ১৩.৭৬%
অকৃষি শ্রমিক: ৮.১৩%
অন্যান্য খাত: ১৫.০৯%
পাহাড়ের ঢালে ও সমতলে প্রচুর পরিমাণে ধান, তিল, তুলা, আদা, হলুদ এবং হরেক রকমের মরসুমী শাকসবজি উৎপাদিত হয়। এছাড়া ফল চাষে এই অঞ্চলের জুড়ি মেলা ভার। এখানকার উৎপাদিত প্রধান ফলগুলো হলো মিষ্টি কলা, আনারস, পেঁপে এবং কাঁঠাল।
এখানকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীদের হাত ধরে গড়ে উঠেছে চমৎকার তাঁতশিল্প। এছাড়াও দারুশিল্প, বুনন শিল্প এবং বাঁশ ও বেতের তৈরি নান্দনিক তৈজসপত্র এখানকার ঘরে ঘরে তৈরি হয়। এই অঞ্চলের প্রধান রপ্তানিযোগ্য পণ্যের মধ্যে রয়েছে কলা, বাঁশ, তুলা, আদা, হলুদ এবং ঐতিহ্যবাহী উপজাতীয় পোশাক।
বান্দরবানের অন্যান্য উপজেলার তুলনায় সদর উপজেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা যথেষ্ট উন্নত ও আধুনিক।
সড়ক নেটওয়ার্ক: উপজেলায় বর্তমানে ৯৩ কিলোমিটার পাকা রাস্তা, ১১২ কিলোমিটার আধা-পাকা রাস্তা এবং ৪৬০ কিলোমিটার মাটির কাঁচা রাস্তা রয়েছে। চাকার গাড়ির পাশাপাশি মোটরসাইকেল ও জিপ গাড়ি প্রধান যাতায়াত মাধ্যম।
নৌপথ: যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের জন্য এখানে ৩০ নটিক্যাল মাইল দীর্ঘ একটি নৌপথ রয়েছে, যা মূলত সাঙ্গু নদীকে কেন্দ্র করে সচল থাকে।
বিলুপ্তপ্রায় বাহন: এক সময় এই অঞ্চলের ঐতিহ্য ছিল পাল্কি, গরুর গাড়ি ও ঘোড়ার গাড়ি, যা আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন পুরোপুরি বিলুপ্তপ্রায়।
শহরের কাছাকাছি হওয়ায় এখানকার মানুষ উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পেয়ে থাকেন, তবে প্রান্তিক পাড়াগুলোতে এখনও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ১টি
ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র: ৫টি
মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র: ১টি
পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র: ১টি
বেসরকারী ডায়াগনস্টিক সেন্টার: ৬টি
উপজেলার স্যানিটেশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এখনও সম্পূর্ণ হয়নি:
স্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিন ব্যবহারকারী পরিবার: ১৮.৩%
অস্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিন ব্যবহারকারী পরিবার: ৫৪.২%
ল্যাট্রিন সুবিধা বহির্ভূত পরিবার: ২৭.count৫%
পানীয় জলের প্রধান উৎস হিসেবে রয়েছে ভূগর্ভস্থ নলকূপ (৩৮.২৩%)। এর পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে সরবরাহকৃত ট্যাপের পানি ব্যবহার করেন ২৩.৪১% পরিবার। তবে পাহাড়ি দুর্গম পাড়ার ৫.৯৯% মানুষ পুকুরের পানি এবং বাকি বিশাল একটি অংশ পাহাড়ের সুপেয় ঝিরি ও ঝরনার পানির ওপর নির্ভর করেন।
পাহাড়ী ভূপ্রকৃতির কারণে সব জায়গায় বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে বান্দরবান সদর উপজেলার প্রায় ৩৫.১৩% পরিবার গ্রিড ও সোলার বিদ্যুতের সুবিধা ভোগ করছেন। বাকি অঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর কাজ পর্যায়ক্রমে চলছে।
বান্দরবান সদর উপজেলা বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। পাহাড়ের চূড়া থেকে মেঘ ছোঁয়ার রোমাঞ্চ আর আদিবাসী জীবনযাত্রার ছোঁয়া পেতে সারা বছরই এখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা থাকে।
উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানসমূহ:

বান্দরবান সদর উপজেলাটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং পাহাড়ী ঐতিহ্যের এক চমৎকার ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে। এই অঞ্চলের সুপ্ত সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে পরিবেশবান্ধব টেকসই পর্যটন বা ইকো-ট্যুরিজমের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। একই সাথে হস্তশিল্প এবং ফলমূল সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুলতে পারলে এখানকার মানুষের জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত হবে এবং এটি জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
মন্তব্য