খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ই জানুয়ারি ২০১৫, ৫:৩৫ এএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত অনন্য পার্বত্য জেলা বান্দরবান। ৪,৪৭৯.০৪ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই জেলার ভূপ্রকৃতি সমতলের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হওয়ায় এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা, জীবিকা এবং পেশাগত কাঠামোতেও রয়েছে ব্যাপক বৈচিত্র্য। এক সময়ের দুর্গম এই পাহাড়ি জনপদের অর্থনীতি এখন আর কেবল জুম চাষে সীমাবদ্ধ নেই। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রাকৃতিক সম্পদ, বনজ শিল্প এবং বিকাশমান পর্যটন খাতকে কেন্দ্র করে এখানে কর্মসংস্থানের নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
এই নিবন্ধে আমরা বান্দরবান জেলার মানুষের প্রধান পেশা, জীবনসংগ্রাম এবং উদীয়মান অর্থনৈতিক খাতগুলো বিস্তারিত তুলে ধরব।
বান্দরবান জেলার সিংহভাগ মানুষের প্রধানতম পেশা হলো কৃষি। এখানকার পাহাড়ি মাটি ও জলবায়ু বিভিন্ন বিশেষ জাতের শস্য এবং ফলমূল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
ঐতিহ্যবাহী জুম চাষ: পাহাড়ের আদিবাসীদের জীবন ও জীবিকার প্রধান উৎস হলো জুম চাষ। পাহাড়ের ঢাল পরিষ্কার করে একসাথে ধান, ভুট্টা, তুলা এবং বিভিন্ন সবজির বীজ বুনে এই চাষ করা হয়। জুমের মিষ্টি ভুট্টা ও স্থানীয় তিন রঙের (সাদা, লাল ও কালো) সুগন্ধি বিন্নি চাল উৎপাদন এখানকার কৃষকদের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস।
মিশ্র ফল চাষ: বর্তমানে বান্দরবানের বহু মানুষ ফল চাষকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। পাহাড়ের ঢালে উৎপাদিত রসালো আনারস, চম্পা কলা, পেঁপে, মিষ্টি কমলা, মাল্টা এবং লেবু দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ করে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা আয় হচ্ছে।
মসলা ও তামাক চাষ: দুর্গম অঞ্চলের অনেক কৃষক আদা, হলুদ এবং বিভিন্ন পাহাড়ি মসলা চাষ করেন। এছাড়া সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর অববাহিকায় শীতকালে তামাক চাষও অনেকের জীবিকার মাধ্যম, যদিও বর্তমানে পরিবেশবান্ধব চাষাবাদের দিকে ঝোঁক বাড়ছে।
বান্দরবান জেলার একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে সরকারি ও অশ্রেণীভুক্ত বনাঞ্চল (Unclassed State Forests), যা মূল্যবান কাঠ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার। এই বনাঞ্চলকে কেন্দ্র করে জেলার বহু মানুষের কর্মসংস্থান গড়ে উঠেছে।
মূল্যবান কাঠের ব্যবসা: বনাঞ্চল থেকে সেগুন, গামারী, গর্জন, শিল কড়ই ও তৈলসুরের মতো মূল্যবান কাঠ আহরণ, পরিবহন এবং আসবাবপত্র তৈরির ব্যবসার সাথে একটি বড় জনগোষ্ঠী যুক্ত।
বাঁশ আহরণ ও বিপণন: কাগজ কলের কাঁচামাল এবং ঘরবাড়ি নির্মাণের জন্য পাহাড় থেকে বাঁশ কেটে সমতলে সরবরাহ করা হাজার হাজার শ্রমিকের প্রধান পেশা। এই কাঠ ও বাঁশ পরিবহনে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদী জলপথ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় নদীকেন্দ্রিক পরিবহন শ্রমিকদেরও একটি বড় কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
গত দুই দশকে বান্দরবানের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় বিপ্লব এনেছে পর্যটন শিল্প। এক সময়ের শান্ত ও নিভৃত এই জেলাটি এখন দেশের শীর্ষস্থানীয় পর্যটন হাবে পরিণত হয়েছে, যা স্থানীয় যুবসমাজের পেশাগত কাঠামো বদলে দিয়েছে।
হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ ব্যবসা: মেঘলা, নীলাচল, নীলগিরি বা থনচির মতো দর্শনীয় স্থানগুলোকে কেন্দ্র করে শত শত হোটেল, কটেজ এবং রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে। এগুলোতে স্থানীয় বহু মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়েছে।
ট্যুরিস্ট গাইড ও চালক: দুর্গম পাহাড়ি ট্রেইল (যেমন: কেওক্রাডং, আমিয়াখুম, বগালেক) ভ্রমণের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয় গাইড বাধ্যতামূলক করায় শত শত পাহাড়ি তরুণ এখন পেশাদার গাইড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এছাড়া পাহাড়ের বিশেষ বাহন ‘চাঁদের গাড়ি’ (জিপ), মাইক্রোবাস এবং সিএনজি চালনাও হাজারো মানুষের প্রধান পেশা।
হস্তশিল্প ও স্মারক ব্যবসা: আদিবাসী নারীদের হাতে বোনা ঐতিহ্যবাহী কোমর তাঁতের চাদর, থামি, পোশাক এবং বাঁশ-কাঠের তৈরি বিভিন্ন শোপিস বা হস্তশিল্প বিক্রি করে অনেক পরিবার জীবিকা নির্বাহ করছে।
বান্দরবানের পেশাগত বৈচিত্র্যের পেছনে এখানকার ১১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর (যেমন: মারমা, ম্রো, ত্রিপুরা, বম ইত্যাদি) সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারার বড় ভূমিকা রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, ত্রিপুরা ও মারমা জনগোষ্ঠীর নারীরা ঘরের কাজের পাশাপাশি অত্যন্ত নিপুণভাবে তাঁত বোনে এবং জুমের কাজে পুরুষদের সমান অবদান রাখে। আবার ম্রো বা বম জনগোষ্ঠীর পুরুষরা বাঁশ ও কাঠের নিখুঁত খাঁচা ও ঘর তৈরিতে পারদর্শী হওয়ায় নির্মাণ শিল্পেও তাঁদের বিশেষ চাহিদা রয়েছে। পাহাড়ে উপজাতি ও অ-উপজাতি জনগোষ্ঠীর এই পারস্পরিক সম্প্রীতি ও বৈচিত্র্যময় কর্মদক্ষতা স্থানীয় অর্থনীতিকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করছে।
বান্দরবানের অর্থনৈতিক অবস্থা দ্রুত পর্যটন ও আধুনিক কৃষির দিকে ধাবিত হওয়ায় মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ছে সত্য, তবে এর কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের কারণে পাহাড়ি ঝিরি-ঝরনা ও বনাঞ্চল দূষিত হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে জুম চাষ ও পাহাড়ি কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
উপসংহার: সার্বিকভাবে, বান্দরবান জেলার পেশা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে এর প্রাকৃতিক সম্পদ, উর্বর ভূমি এবং পর্যটনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে যদি এই খাতগুলোকে আরও আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়, তবে পাহাড়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান যেমন উন্নত হবে, তেমনি বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতেও বান্দরবান জেলা আরও বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
মন্তব্য