খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জানুয়ারি ২০১৫, ৬:৪০ এএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বান্দরবান পার্বত্য জেলা মূলত তার প্রাকৃতিক নান্দনিকতা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য দেশ-বিদেশে পরিচিত। তবে ভৌগোলিক দুর্গমতার কারণে এক সময় এই অঞ্চলটি জাতীয় উন্নয়নের মূলধারা থেকে কিছুটা পিছিয়ে ছিল। বর্তমান সময়ে সরকার, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্থানীয় জেলা পরিষদ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সমন্বয়ে এখানে বেশ কিছু বৃহৎ ও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। অবকাঠামো, কৃষি, স্বাস্থ্য এবং সর্বাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি খাতের এই প্রকল্পগুলো বান্দরবানের অর্থনীতি ও জনজীবনে এক বৈপ্লবিক রূপান্তর নিয়ে আসছে।
নিচে বান্দরবান জেলার উল্লেখযোগ্য বৃহৎ প্রকল্পসমূহের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হলো:
যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণই পাহাড়ের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগের তত্ত্বাবধানে বান্দরবানে বেশ কিছু যুগান্তকারী সড়ক ও সেতু নির্মাণ প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে:
লামা-রূপসীপাড়া সড়ক ও আরসিসি ব্রিজ নির্মাণ: লামা উপজেলার অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়াতে এই প্রকল্পের আওতায় শক্তিশালী আরসিসি ব্রিজ ও উন্নত সংযোগ সড়ক (Approach Road) নির্মাণ করা হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ ও সুপরিকল্পিত ব্যয়ের মাধ্যমে এই প্রকল্পের ভৌত অবকাঠামো শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে, যা স্থানীয় কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে বড় ভূমিকা রাখছে।
নাইক্ষ্যংছড়ি-তুমব্রু সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প: বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার কৌশলগত ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এই মেগা সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। শতভাগ সফলভাবে সম্পন্ন হওয়া এই সড়কটি সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি স্থানীয় পাহাড়ি পাড়াগুলোর সাথে মূল শহরের যোগাযোগ সহজ করেছে।
থানচি-আলীকদম সড়ক (ডিম পাহাড় ট্রেইল): দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ ও দৃষ্টিনন্দন এই সড়কটি বান্দরবানের পর্যটন শিল্পে এক নতুন বিপ্লব এনেছে। এটি দুই উপজেলার মধ্যকার দূরত্ব কমানোর পাশাপাশি পর্যটকদের যাতায়াতকে করেছে নিরাপদ।
বান্দরবানের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী জুম চাষ এবং পাহাড়ী ফল চাষের ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ে পানির তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় কৃষিকাজ ব্যাহত হতো। এই সমস্যা সমাধানে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ২০২৪ থেকে ২০২৭ সাল মেয়াদী একটি মেগা কৃষি প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
ঝিরি ও ছড়ায় বাঁধ নির্মাণ: প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন দুর্গম উপজেলায় প্রাকৃতিক ঝিরি ও পাহাড়ি ছড়াগুলোতে বৈজ্ঞানিক উপায়ে গাইড ওয়াল ও বাঁধ (Dam) নির্মাণ করা হচ্ছে।
আধুনিক সেচ ব্যবস্থা: এই বাঁধগুলোর মাধ্যমে পানি ধরে রেখে আধুনিক সেচ নালা ও পাম্পের সাহায্যে পাহাড়ের উঁচুতে ফল ও ফসলের ক্ষেতে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে, যা পাহাড়ি কৃষির ফলন বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
দুর্গম পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ বিশেষ স্বাস্থ্য প্রকল্প পরিচালনা করছে। বিশেষ করে রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি এবং আলীকদম উপজেলার মতো দুর্গম এলাকাগুলোকে এই প্রকল্পের মূল ফোকাস করা হয়েছে।
মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা: প্রকল্পের আওতায় শত শত গর্ভবতী নারীকে নিয়মিত মাতৃস্বাস্থ্য সেবা ও প্রসবকালীন জটিলতা নিরসনে নিরাপদ প্রসব (Safe Delivery) সেবা দেওয়া হচ্ছে।
পরিবার পরিকল্পনা ও শিশু পুষ্টি: প্রান্তিক পাহাড়ী পাড়াগুলোতে শিশু স্বাস্থ্য রক্ষা এবং পরিবার পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে নিয়মিত মেডিকেল ক্যাম্প ও বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
বান্দরবানকে একটি আধুনিক ও স্মার্ট জেলায় রূপান্তর করতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) অধিদপ্তর দেশব্যাপী চলমান “ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন (EDC)” প্রকল্পের অধীনে এই পার্বত্য অঞ্চলেও এক বিশাল কর্মযজ্ঞ চালাচ্ছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য পাহাড়ের প্রান্তিক তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং ও প্রযুক্তির সাথে যুক্ত করা।
এই মেগা প্রকল্পের মূল উপাদানসমূহ:
হাই-স্পিড ইন্টারনেট: পুরো জেলায় ১,০৯,২৪৪টি উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান।
শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব: নতুন প্রজন্মকে আইটি শিক্ষায় দক্ষ করতে ১০,০০০টি আধুনিক ডিজিটাল ল্যাব ও ৫৭টি বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপন।
জয় ডি-সেন্টার ও সার্ভিস ডিভাইস: উপজেলার তৃণমূল পর্যায়ে ৫৫৫টি ‘জয় ডি-সেন্টার’ এবং প্রায় ১৭,৩১৪টি ডিজিটাল সার্ভিস ডেলিভারি ডিভাইস স্থাপন।
স্মার্ট এগ্রিকালচার ও ড্রোন প্রযুক্তি: জেলার ১০টি প্রত্যন্ত গ্রামকে আধুনিক ‘ডিজিটাল ভিলেজে’ রূপান্তর করা হচ্ছে। এছাড়া, আধুনিক মৎস্য চাষ ও পাহাড়ী খামার পর্যবেক্ষণের জন্য ২০,০০০ মৎস্য খামারিকে উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে এই প্রকল্পে।
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বান্দরবানের সামাজিক সচেতনতা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোও সমান্তরালভাবে কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হলো স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘গ্রাউস’ (GRAUS)-এর পরিচালিত “আস্থা” প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পাহাড়ে বাল্যবিয়ে রোধ, জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা বন্ধ, মানবাধিকার সচেতনতা এবং স্থানীয় যুবসমাজকে আত্মকর্মসংস্থানমুখী করতে বিভিন্ন সামাজিক সেমিনার, কর্মশালা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে।

সবশেষে বলা যায়, এই বৃহৎ প্রকল্পগুলো বান্দরবান পার্বত্য জেলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক চেহারাই বদলে দিচ্ছে। সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন পর্যটন শিল্পকে সমৃদ্ধ করছে, স্বাস্থ্য ও কৃষি প্রকল্পগুলো মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করছে এবং আইসিটি প্রজেক্টগুলো পাহাড়ের দুর্গমতাকে জয় করে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল দুনিয়ার সাথে বান্দরবানকে যুক্ত করছে। এই প্রকল্পগুলোর টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে আগামী দিনে বান্দরবান বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ স্বাবলম্বী ও আধুনিক জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
মন্তব্য