খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জানুয়ারি ২০১৫, ৯:৪৬ এএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত মেঘ-পাহাড়ের দেশ বান্দরবান। অনন্য ভূপ্রকৃতি এবং সুউচ্চ গিরি শ্রেণীর কারণে এই জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা সমতলের জেলাগুলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এক সময় এই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে যাতায়াত করা অসম্ভব মনে হলেও, বর্তমান সময়ে সড়ক অবকাঠামোর অভূতপূর্ব উন্নয়নের ফলে বান্দরবান এখন দেশী-বিদেশী পর্যটক এবং ব্যবসায়ী উভয়ের জন্যই অনেক সহজলভ্য হয়ে উঠেছে।
নিচে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটসহ ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং বান্দরবানের অভ্যন্তরীণ উপজেলাগুলোর নিখুঁত যাতায়াত রুট এবং যানবাহনের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হলো:
বান্দরবানের প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৫৩১ খ্রিষ্টাব্দে তুংগো সাম্রাজ্যের হাইসাওয়াদি রাজ্যের প্রথম সার্কেল প্রধান তবাং শোয়েথীর দিনলিপি থেকেই এই পাহাড়ি অঞ্চলের আদি শাসন ব্যবস্থার তথ্য মেলে। পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসনামলে বোমাং রাজবংশকে ‘বোমাং সার্কেল’ হিসেবে দাপ্তরিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯০০ সালের ‘চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন’ এই অঞ্চলের স্বকীয় যোগাযোগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর, ১৯৫১ সালে এটি রাঙ্গামাটির অধীনে একটি মহকুমা হিসেবে যাত্রা করে। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮১ সালের ১৮ এপ্রিল, বান্দরবান ও লামা মহকুমাকে একত্রিত করে ৭টি উপজেলার সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র ‘বান্দরবান পার্বত্য জেলা’ গঠন করা হয়। এরপর থেকেই এই অঞ্চলের আধুনিক সড়ক যোগাযোগের মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।
ঢাকা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বান্দরবান জেলায় আসার প্রধান ও একমাত্র মাধ্যম হলো সড়কপথ। কারণ এখানে সরাসরি কোনো রেললাইন বা বিমানবন্দর নেই।
ঢাকা (সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, কলাবাগান বা আরামবাগ) থেকে প্রতিদিন সকাল এবং রাতে বেশ কিছু স্বনামধন্য দূরপাল্লার বাস বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।
প্রধান বাস সার্ভিসসমূহ: এস. আলম, সৌদিয়া, ইউনিক, ডলফিন, শ্যামলী ও সেন্টমার্টিন ট্রাভেলস।
ভাড়া ও সময়: এসি ও নন-এসি ভেদে বাসগুলোর টিকিটের মূল্য সাধারণত ৭০০ থেকে ১,৫০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। ঢাকা থেকে বান্দরবান পৌঁছাতে সাধারণত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগে।
চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রতি ৩০ মিনিট পর পর বান্দরবানের বাস ছাড়ে।
বাস সার্ভিস: পূবালী ও পূর্বাণী চেয়ারকোচ।
ভাড়া ও সময়: বাস ভাড়া সাধারণত ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। চট্টগ্রাম থেকে বান্দরবান শহরে পৌঁছাতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে।
সরাসরি বিমান বা রেল যোগাযোগ না থাকলেও পর্যটকরা আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য বিকল্প রুট ব্যবহার করতে পারেন:
ট্রেন বা বিমান রুট: প্রথমে ঢাকা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ট্রেন (যেমন: সুবর্ণ এক্সপ্রেস, সোনার বাংলা) অথবা ডমেস্টিক ফ্লাইটে চড়ে চট্টগ্রাম শহরে আসতে হবে।
চট্টগ্রাম থেকে কানেক্টিভিটি: চট্টগ্রাম স্টেশন বা বিমানবন্দর থেকে সিএনজি/ট্যাক্সি নিয়ে বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালে এসে সেখান থেকে পূবালী বা পূর্বাণী বাসে চড়ে সহজে বান্দরবান পৌঁছানো যায়। এছাড়া সরাসরি প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাস রিজার্ভ করেও বান্দরবান যাওয়া সম্ভব।
বান্দরবান শহরের মূল বাস টার্মিনাল বা রুমা বাস স্টেশন থেকে জেলার ৭টি উপজেলায় যাওয়ার চমৎকার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক রয়েছে। পাহাড়ি খাড়া রাস্তা ও আঁকাবাঁকা মোড় পাড়ি দেওয়ার জন্য এখানে বিশেষ এক ধরনের ফোর-হুইল ড্রাইভ জিপ গাড়ি ব্যবহৃত হয়, যা স্থানীয়ভাবে ‘চাঁদের গাড়ি’ নামে পরিচিত। এছাড়া লোকাল রুটগুলোতে সিএনজি চালিত অটোরিকশাও চলে।
| রুট বা গন্তব্য | যানবাহনের ধরণ | সাধারণ সময়সূচী |
| বান্দরবান থেকে রোয়াংছড়ি | চাঁদের গাড়ি ও সিএনজি | সকাল ৮:৩০ থেকে বিকেল ৪:০০ পর্যন্ত (লোকাল ও রিজার্ভ) |
| বান্দরবান থেকে রুমা | চাঁদের গাড়ি (জিপ) | সকাল ৯:০০ থেকে বিকেল ৩:০০ পর্যন্ত নিয়মিত চলে |
| বান্দরবান থেকে থানচি | লোকাল বাস ও চাঁদের গাড়ি | বাস সকাল ৮:০০ থেকে বিকেল ৩:০০ পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় ছাড়ে |
| বান্দরবান থেকে আলীকদম | জিপ ও পূর্বাণী চেয়ারকোচ | সরাসরি বাস দুপুর থেকে বিকেল ৩:০০ টার মধ্যে ছেড়ে যায় |
| বান্দরবান থেকে লামা | জিপ ও লোকাল বাস | দুপুর ২:৩০ এবং বিকেল ৩:০০ টায় প্রধান ট্রিপগুলো ছাড়ে |
| বান্দরবান থেকে নাইক্ষ্যংছড়ি | মাইক্রোবাস ও লোকাল জিপ | সাধারণত সকাল ৭:০০ টা থেকে ট্রিপ শুরু হয় |
রুট বোনাস: অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য বান্দরবান-চিম্বুক-থানচি-আলীকদম-বাইশারী-ঘুমধুম সড়কটি দেশের অন্যতম সুন্দর এবং রোমাঞ্চকর পাহাড়ি রুট হিসেবে পরিচিত।
১. চাঁদের গাড়ি রিজার্ভ: আপনি যদি গ্রুপ নিয়ে বগালেক, নীলগিরি বা থানচি যেতে চান, তবে বান্দরবান জিপ স্টেশন থেকে অফিশিয়াল কাউন্টারের মাধ্যমে চাঁদের গাড়ি রিজার্ভ করুন। চালকের মোবাইল নম্বর এবং গাড়ির নম্বর অবশ্যই সংগ্রহে রাখবেন।
২. পাহাড়ি রাস্তার সতর্কতা: পাহাড়ি রাস্তাগুলো অত্যন্ত খাড়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকযুক্ত। তাই দক্ষ পাহাড়ি চালক ছাড়া নিজে ড্রাইভ করার চেষ্টা না করাই উত্তম। বর্ষাকালে ল্যান্ডস্লাইড বা পাহাড় ধসের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের আপডেট জেনে রাস্তায় বের হোন।
৩. নিরাপত্তা ও চেকপোস্ট: বান্দরবানের অভ্যন্তরীণ উপজেলাগুলোতে যাতায়াতের সময় বেশ কিছু আর্মি চেকপোস্ট (যেমন: চিম্বুক বা রুমা ঘাট) পার হতে হয়। সেখানে পর্যটকদের নাম, ঠিকানা ও এনআইডি (NID) কার্ডের তথ্য এন্ট্রি করতে হয়। তাই পর্যাপ্ত পরিমাণে আইডি কার্ডের ফটোকপি সাথে রাখুন।

বান্দরবান পার্বত্য জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং সবুজে ঘেরা পাহাড় আর মেঘের ভেতর দিয়ে চাঁদের গাড়িতে ছুটে চলা নিজেই একটি রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং স্থানীয় প্রশাসনের তদারকিতে এই যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত আরও উন্নত ও সুসংগঠিত হচ্ছে, যা এই অঞ্চলের পর্যটন শিল্প ও অর্থনীতিকে সাফল্যের এক নতুন শিখরে নিয়ে যাচ্ছে।
মন্তব্য